ডায়াবেটিস কি বংশগত কারণেও হয়?
ডায়াবেটিস কেন হয়, সে সম্পর্কেও আমাদের ধারণায় বড় ধরনের ভুল রয়েছে। ডায়াবেটিসের কারণ সম্পর্কে অনেককেই বলতে শুনি এবং পত্রপত্রিকায় ডায়াবেটিস সম্পর্কে অনেক নিবন্ধে অনেক ডাক্তারকে লেখতে দেখি, বংশগত কারণেও নাকি অনেক মানুষের ডায়াবেটিস হয়।
খুব গভীরভাবে দেখেছি, ডায়াবেটিস সম্পর্কে এমন বিশ্বাস বা বক্তব্যের কোনো বাস্তবতা নেই। একটা সময় ছিল, সমাজের পাঁচ শতাংশ মানুষেরও ডায়াবেটিস ছিল না। ডায়াবেটিস নামক কোনো রোগের সাথে মানুষের তেমন পরিচয়ও ছিল না। মানুষ পরিশ্রমের বিভিন্ন কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতো। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ একেবারে শেষ বয়সে যখন কাজকর্ম থেকে পুরো অবসরে চলে যেতো, তখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতো। যে সমাজে এক সময় ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা হাতে গোনা যেতো, সেই সমাজে এখন ডায়াবেটিসের এতো ছড়াছড়ি কেন? অবস্থা এমন পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, অল্প ক’বছর পর হয়তো ৪০-৫০ বছরের বেশি বয়সী ডায়াবেটিসহীন মানুষ খুঁজে বের করাও কষ্টকর হয়ে পড়তে পারে। শিশুরাও এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকহারে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে!
আমার এক আত্মীয়ের পরিবারে পাঁচ-পাঁচজন লোক ডায়াবেটিস রোগী! আমার এক সহকর্মীর চার বোনের মধ্যে তিনজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত! আমার এক বন্ধু আছে মামুন নামে। সে বললো, তাদের পরিবারে সে ব্যতীত তার বাবা-মা, ভাই-বোন (মোট ৭ জন) সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে! আমার বিশ্বাস, এরকম একই পরিবারে একাধিক মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার অনেক ঘটনা অনেকের জানা থাকতে পারে।
চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও ডায়াবেটিস রোগী ছিল সমাজে দুর্লভ, আর এখন ঘরে ঘরে মানুষের ডায়াবেটিস, এটাই বাস্তবতা। ডায়াবেটিসহীন সেই সমাজে এখন ডায়াবেটিসের এতো ছড়াছড়ি কেন? যদি আগে অধিকাংশ মানুষের ডায়াবেটিস থাকতো, তাহলেই এখন বলা যেতো, ডায়াবেটিস বংশগত কারণে হয়ে থাকে। বিশে^র প্রায় সব দেশে এমন লক্ষ লক্ষ পরিবারে এখন অনেকের ডায়াবেটিস, যেসব পরিবারে আগে কারো ডায়াবেটিস ছিল না। তাহলে রোগটি কিভাবে বংশগত হলো? আমার বাবা-মা, দাদা-দাদী বা নানা-নানী কারোই ডায়াবেটিস ছিল না, অথচ আমার দু’ভাই ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসের শিকার হয়ে গেছেন কিভাবে! তাঁদের জন্মে কি তাহলে দোষ ছিল?!
আরেকটা বিষয়, বংশগত রোগ হলে জন্মের সময়ই তারা ডায়াবেটিস নিয়ে জন্মাতেন। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে, তা-ও আবার শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার পর, মেদ-চর্বি বেড়ে যাবার পর তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেন কেন? তাহলে শরীরে মেদ-চর্বি বাড়লেই কি সন্তানরা সত্যিকারের সন্তান হয়ে ওঠেন?! যখন চিকন ছিলেন, তখন নয়, মোটা হয়ে যাবার পর তাদের শরীরে ডায়াবেটিস এসে হাজির হলো কেন?! তাছাড়া বাবা/মা কেউ আক্রান্ত হবার আগে আগেই এখন অনেক সন্তান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০/৫৫ বছর বয়সী অনেক ডায়াবেটিস রোগীর পূর্বপুরুষেরও ডায়াবেটিস দেখেই ডাক্তাররা এবং সাধারণ মানুষ মনে করে বসে ডায়াবেটিস বংশগত রোগ। কিন্তু এদিকে লক্ষ্য করে না, বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অধিকাংশেরই বাবা-মা বা পূর্বপুরুষ কারো ডায়াবেটিস ছিল না। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী যারা এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অনেকের পূর্বপুরুষের ডায়াবেটিস আছে দেখেই রোগটিকে বংশগত মনে করা যে ভুল, তা প্রমাণিত হবে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অধিকাংশেরই বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের যে ডায়াবেটিস ছিল না, সেদিকে লক্ষ্য করলে।
আমার এক সহকর্মীর বড় ছেলেটি, নাম ইমরুল হাসান অয়ন, ২০১৬ সালে যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে মাত্র, তখন তার ডায়াবেটিস দেখা দেয়। এগারো কি বারো বছর বয়সে কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ঘটনা, আমি জানি, অনেকের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। ছেলেটির বাবা-মা কারোই ডায়াবেটিস নেই। তবে ছেলেটির ওজন খুব বেশি। ২০১০ সালেও মহসিন নামে পঞ্চম শ্রেণি পড়–য়া একটি ছেলে সম্পর্কে জানতে পারলাম, ওর নাকি ডায়াবেটিস। ওই ছেলেটিও স্থূলকায় ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, কথাটি তখন আমারও তেমন বিশ্বাস হয়নি। কারণ এর আগে এমন ঘটনার সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। ইদানিং পত্রপত্রিকায়ও শিশুদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সংক্রান্ত অনেক লেখা দেখতে পাই। আমাদের জানাশোনায় যেসব শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে, দেখবেন তাদের অনেকেরই বাবা-মা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নন। তবু কেন বলা হয়, ডায়াবেটিস বংশগত কারণেও হয়ে থাকে?
অসংখ্য ডায়াবেটিস রোগীর সাথে কথাটির বাস্তবতা মেলানোর চেষ্টা করে লাভ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা এসব কথা বলি, তারা খুব ভালোভাবে যাচাই বাছাই করা ছাড়াই বলি। রোগটির কারণ সম্পর্কে অল্পস্বল্প ভেবে যখন কোনো কূল না পাই, তখন হুট করে বলে বসি, এটি বংশগত রোগ। অনেক সময় তাকিয়েও দেখি না, পরিচিত যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, সবার বাবা-মা কারো ডায়াবেটিস ছিল কিনা বা আমার যে ডায়াবেটিস হয়েছে, আমার বাবা-মা কারো ডায়াবেটিস ছিল/আছে কিনা?
বংশগত কারণেও মানুষ অনেক রোগে আক্রান্ত হয়, এটা সত্য। তাই বলে, আপাত দৃষ্টিতে ডায়াবেটিসের কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে এই রোগটিকেও বংশগত রোগের কাতারে ফেলে দিতে হবে, এটা তো ঠিক নয়। ভুল ধারণাটি এখনই দূর করা না গেলে ৫০-৬০ বছর পর মানুষের এই ধারণা দূর করা খুবই কঠিন হবে। কারণ এখন তো মানুষ অহরহ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ৫০-৬০ বছর পর তখনকার প্রজন্মের কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে যখন দেখবে তার পূর্বপুরুষদেরও ডায়াবেটিস ছিল, তখন সে নিশ্চিতভাবে রোগটিকে বংশগত রোগ মনে করবে। তখন এ ধারণা ভুল প্রমাণ করা অনেকটা অসম্ভব হয়ে যাবে।
৫০-৬০ বছর আগে খুব কম সংখ্যক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতো। এখন কেন ব্যাপকহারে আক্রান্ত হচ্ছে? প্রশ্নটির উত্তরের মধ্যেই ‘ডায়াবেটিস বংশগতভাবেও হয় কিনা?’ এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে।
৫০-৬০ বছর আগে বা তারও আগে মানুষের জীবন ছিল পরিশ্রমসাধ্য। মানুষকে বিভিন্ন ভাবে শারীরিক পরিশ্রমের সাথে জড়িত থাকতে হতো। চলাফেরায় ছিল পরিশ্রম, প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটা কাজে ছিল শারীরিক পরিশ্রম। শারীরিক পরিশ্রম বেশি বেশি করার কারণে মানুষের শরীরে কোলেস্টেরল জমার সুযোগ পেতো না। বেশি বেশি খেলেও অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম করার কারণে মানুষ মোটা হতো না, মানুষের শরীরে কোলেস্টেরল জমার সুযোগ পেতো না। তাই ডায়াবেটিসও শরীরে জন্ম নেয়ার সুযোগ পেতো না। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে কাজকর্মে আরামদায়ক সব প্রযুক্তি, চলাফেরার ক্ষেত্রে যানবাহনের ব্যাপক প্রচলন এবং মানুষ ব্যাপকহারে আরামপ্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্থ হবার কারণে শারীরিক পরিশ্রমের সাথে মানুষের সম্পর্ক অনেক কমে যাওয়ায় মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিজনিত ভয়াবহ রোগগুলো। এই সত্যটা যারা উপলব্ধি করতে পারেন না, সাধারণ মানুষ বা ডাক্তার, তারাই ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ মনে করে ভুল করে, বিভ্রান্ত করেন অন্যকে।
ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ বলে প্রচার করে আমরা শুধু ভুল করছি না, পুরো মানবজাতির মারাত্মক ক্ষতিও করে যাচ্ছি। বংশগত রোগ মনে করার কারণে আমরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়াকে নিয়তির উপরই ছেড়ে দিয়ে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করছি না। অথচ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার প্রকৃত কারণটা আমাদের সামনে স্পষ্ট হলে তথা বেশি বেশি খাওয়া, মুটিয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমহীন থাকার কারণে ডায়াবেটিস হয়, এই সত্যটা আমাদের উপলব্ধিতে এলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা আমাদের পক্ষে সহজ ও সম্ভব হতো। একটা ঘটনা উল্লেখ করছি।
আমার যে সহকর্মীর চার বোনের মধ্যে তিনজনেরই ডায়াবেটিস, তাঁর নাম নাজনীন আক্তার। তাঁর ভাই মাত্র একজন। তিনি প্রায়ই কথায় কথায় বলেন, ‘আমার অন্য তিন বোনের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আমিও মনে হয় যে কোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারি।’ একদিন এমন কথা বলাতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এমনটা মনে করছেন?’ তিনি বলেন, ‘আমার মায়েরও ডায়াবেটিস ছিল।’ আমি বলি, ‘তাতে কী হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘আমার বোনেরা ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার বাবা-মা কারো কি ডায়াবেটিস ছিল?’ আমার বোনেরা ‘হ্যাঁ’ বলার পর ডাক্তার বলেন, ‘আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকাতেই আপনাদের ডায়াবেটিস হয়েছে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ভাইও কি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত?’ তিনি বলেন, ‘না’।
আমি বললাম, ‘তাহলে আপনার এবং আপনার ভাইয়ের ডায়াবেটিস নেই কেন? বংশগত হলে তো কেউ বাকি থাকতো না। আরেকটা বিষয় ভেবে দেখুন, ডাক্তাররা বলছেন, আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকাতে আপনার বোনেরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার নানী বা নানার ডায়াবেটিস ছিল কিনা? যদি না থাকে, তাহলে আপনার মায়ের ডায়াবেটিস হলো কোত্থেকে? শুধু ডাক্তারের কথার কারণেই আপনার মনে এখন ভয় কাজ করছে এই ভেবে, আপনি যে কোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বংশগত হলে আপনার বোনেরা জন্মের সময়ই শরীরে ডায়াবেটিস নিয়েই জন্মগ্রহণ করতেন এবং তা তখনই, যখন আপনার বোনদের জন্মের আগ থেকেই আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকতো। দেখা গেছে, আপনারা সব ভাই-বোন জন্মগ্রহণ করার অনেক বছর পর আপনার মায়ের বয়স যখন ৫০-৬০ বছর এবং আপনার বোনদের বয়স ৪০-৪৫ বছর হয়ে গেছে, তখন আপনার মা এবং আপনার বোনেরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। আপনার বোনদের জন্মের অনেক বছর পর আপনার মায়ের শরীরে সৃষ্টি হওয়া ডায়াবেটিস কিভাবে ৪০-৪৫ বছর বয়সী আপনার বোনদের শরীরে সংক্রমিত হলো, ডাক্তার কি সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে?’
খুব গভীরভাবে দেখেছি, ডায়াবেটিস সম্পর্কে এমন বিশ্বাস বা বক্তব্যের কোনো বাস্তবতা নেই। একটা সময় ছিল, সমাজের পাঁচ শতাংশ মানুষেরও ডায়াবেটিস ছিল না। ডায়াবেটিস নামক কোনো রোগের সাথে মানুষের তেমন পরিচয়ও ছিল না। মানুষ পরিশ্রমের বিভিন্ন কাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকতো। খুব অল্প সংখ্যক মানুষ একেবারে শেষ বয়সে যখন কাজকর্ম থেকে পুরো অবসরে চলে যেতো, তখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতো। যে সমাজে এক সময় ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা হাতে গোনা যেতো, সেই সমাজে এখন ডায়াবেটিসের এতো ছড়াছড়ি কেন? অবস্থা এমন পর্যায়ের দিকে যাচ্ছে, অল্প ক’বছর পর হয়তো ৪০-৫০ বছরের বেশি বয়সী ডায়াবেটিসহীন মানুষ খুঁজে বের করাও কষ্টকর হয়ে পড়তে পারে। শিশুরাও এখন বিশ্বব্যাপী ব্যাপকহারে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে শুরু করেছে!
আমার এক আত্মীয়ের পরিবারে পাঁচ-পাঁচজন লোক ডায়াবেটিস রোগী! আমার এক সহকর্মীর চার বোনের মধ্যে তিনজনই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত! আমার এক বন্ধু আছে মামুন নামে। সে বললো, তাদের পরিবারে সে ব্যতীত তার বাবা-মা, ভাই-বোন (মোট ৭ জন) সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে! আমার বিশ্বাস, এরকম একই পরিবারে একাধিক মানুষের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার অনেক ঘটনা অনেকের জানা থাকতে পারে।
চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেও ডায়াবেটিস রোগী ছিল সমাজে দুর্লভ, আর এখন ঘরে ঘরে মানুষের ডায়াবেটিস, এটাই বাস্তবতা। ডায়াবেটিসহীন সেই সমাজে এখন ডায়াবেটিসের এতো ছড়াছড়ি কেন? যদি আগে অধিকাংশ মানুষের ডায়াবেটিস থাকতো, তাহলেই এখন বলা যেতো, ডায়াবেটিস বংশগত কারণে হয়ে থাকে। বিশে^র প্রায় সব দেশে এমন লক্ষ লক্ষ পরিবারে এখন অনেকের ডায়াবেটিস, যেসব পরিবারে আগে কারো ডায়াবেটিস ছিল না। তাহলে রোগটি কিভাবে বংশগত হলো? আমার বাবা-মা, দাদা-দাদী বা নানা-নানী কারোই ডায়াবেটিস ছিল না, অথচ আমার দু’ভাই ইতোমধ্যে ডায়াবেটিসের শিকার হয়ে গেছেন কিভাবে! তাঁদের জন্মে কি তাহলে দোষ ছিল?!
আরেকটা বিষয়, বংশগত রোগ হলে জন্মের সময়ই তারা ডায়াবেটিস নিয়ে জন্মাতেন। কিন্তু পরিণত বয়সে এসে, তা-ও আবার শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়ার পর, মেদ-চর্বি বেড়ে যাবার পর তারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেন কেন? তাহলে শরীরে মেদ-চর্বি বাড়লেই কি সন্তানরা সত্যিকারের সন্তান হয়ে ওঠেন?! যখন চিকন ছিলেন, তখন নয়, মোটা হয়ে যাবার পর তাদের শরীরে ডায়াবেটিস এসে হাজির হলো কেন?! তাছাড়া বাবা/মা কেউ আক্রান্ত হবার আগে আগেই এখন অনেক সন্তান ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।
বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০/৫৫ বছর বয়সী অনেক ডায়াবেটিস রোগীর পূর্বপুরুষেরও ডায়াবেটিস দেখেই ডাক্তাররা এবং সাধারণ মানুষ মনে করে বসে ডায়াবেটিস বংশগত রোগ। কিন্তু এদিকে লক্ষ্য করে না, বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অধিকাংশেরই বাবা-মা বা পূর্বপুরুষ কারো ডায়াবেটিস ছিল না। ৩৫ বছরের বেশি বয়সী যারা এখন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অনেকের পূর্বপুরুষের ডায়াবেটিস আছে দেখেই রোগটিকে বংশগত মনে করা যে ভুল, তা প্রমাণিত হবে বর্তমানে ৬০ বছরের বেশি বয়সী যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তাদের অধিকাংশেরই বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের যে ডায়াবেটিস ছিল না, সেদিকে লক্ষ্য করলে।
আমার এক সহকর্মীর বড় ছেলেটি, নাম ইমরুল হাসান অয়ন, ২০১৬ সালে যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে মাত্র, তখন তার ডায়াবেটিস দেখা দেয়। এগারো কি বারো বছর বয়সে কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার ঘটনা, আমি জানি, অনেকের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে। ছেলেটির বাবা-মা কারোই ডায়াবেটিস নেই। তবে ছেলেটির ওজন খুব বেশি। ২০১০ সালেও মহসিন নামে পঞ্চম শ্রেণি পড়–য়া একটি ছেলে সম্পর্কে জানতে পারলাম, ওর নাকি ডায়াবেটিস। ওই ছেলেটিও স্থূলকায় ছিল। সত্যি কথা বলতে কি, কথাটি তখন আমারও তেমন বিশ্বাস হয়নি। কারণ এর আগে এমন ঘটনার সাথে আমি পরিচিত ছিলাম না। ইদানিং পত্রপত্রিকায়ও শিশুদের ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া সংক্রান্ত অনেক লেখা দেখতে পাই। আমাদের জানাশোনায় যেসব শিশু ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে, দেখবেন তাদের অনেকেরই বাবা-মা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নন। তবু কেন বলা হয়, ডায়াবেটিস বংশগত কারণেও হয়ে থাকে?
অসংখ্য ডায়াবেটিস রোগীর সাথে কথাটির বাস্তবতা মেলানোর চেষ্টা করে লাভ হয়নি। প্রকৃতপক্ষে আমরা যারা এসব কথা বলি, তারা খুব ভালোভাবে যাচাই বাছাই করা ছাড়াই বলি। রোগটির কারণ সম্পর্কে অল্পস্বল্প ভেবে যখন কোনো কূল না পাই, তখন হুট করে বলে বসি, এটি বংশগত রোগ। অনেক সময় তাকিয়েও দেখি না, পরিচিত যারা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, সবার বাবা-মা কারো ডায়াবেটিস ছিল কিনা বা আমার যে ডায়াবেটিস হয়েছে, আমার বাবা-মা কারো ডায়াবেটিস ছিল/আছে কিনা?
বংশগত কারণেও মানুষ অনেক রোগে আক্রান্ত হয়, এটা সত্য। তাই বলে, আপাত দৃষ্টিতে ডায়াবেটিসের কোনো কারণ খুঁজে না পেয়ে এই রোগটিকেও বংশগত রোগের কাতারে ফেলে দিতে হবে, এটা তো ঠিক নয়। ভুল ধারণাটি এখনই দূর করা না গেলে ৫০-৬০ বছর পর মানুষের এই ধারণা দূর করা খুবই কঠিন হবে। কারণ এখন তো মানুষ অহরহ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। ৫০-৬০ বছর পর তখনকার প্রজন্মের কেউ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে যখন দেখবে তার পূর্বপুরুষদেরও ডায়াবেটিস ছিল, তখন সে নিশ্চিতভাবে রোগটিকে বংশগত রোগ মনে করবে। তখন এ ধারণা ভুল প্রমাণ করা অনেকটা অসম্ভব হয়ে যাবে।
৫০-৬০ বছর আগে খুব কম সংখ্যক মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতো। এখন কেন ব্যাপকহারে আক্রান্ত হচ্ছে? প্রশ্নটির উত্তরের মধ্যেই ‘ডায়াবেটিস বংশগতভাবেও হয় কিনা?’ এই প্রশ্নটির উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে।
৫০-৬০ বছর আগে বা তারও আগে মানুষের জীবন ছিল পরিশ্রমসাধ্য। মানুষকে বিভিন্ন ভাবে শারীরিক পরিশ্রমের সাথে জড়িত থাকতে হতো। চলাফেরায় ছিল পরিশ্রম, প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় প্রতিটা কাজে ছিল শারীরিক পরিশ্রম। শারীরিক পরিশ্রম বেশি বেশি করার কারণে মানুষের শরীরে কোলেস্টেরল জমার সুযোগ পেতো না। বেশি বেশি খেলেও অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম করার কারণে মানুষ মোটা হতো না, মানুষের শরীরে কোলেস্টেরল জমার সুযোগ পেতো না। তাই ডায়াবেটিসও শরীরে জন্ম নেয়ার সুযোগ পেতো না। কিন্তু বিগত কয়েক দশক ধরে কাজকর্মে আরামদায়ক সব প্রযুক্তি, চলাফেরার ক্ষেত্রে যানবাহনের ব্যাপক প্রচলন এবং মানুষ ব্যাপকহারে আরামপ্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্থ হবার কারণে শারীরিক পরিশ্রমের সাথে মানুষের সম্পর্ক অনেক কমে যাওয়ায় মানুষকে আক্রমণ করতে শুরু করেছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হার্ট অ্যাটাকের মতো কোলেস্টেরল বৃদ্ধিজনিত ভয়াবহ রোগগুলো। এই সত্যটা যারা উপলব্ধি করতে পারেন না, সাধারণ মানুষ বা ডাক্তার, তারাই ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ মনে করে ভুল করে, বিভ্রান্ত করেন অন্যকে।
ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ বলে প্রচার করে আমরা শুধু ভুল করছি না, পুরো মানবজাতির মারাত্মক ক্ষতিও করে যাচ্ছি। বংশগত রোগ মনে করার কারণে আমরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়াকে নিয়তির উপরই ছেড়ে দিয়ে ডায়াবেটিস প্রতিরোধের কোনো চেষ্টা করছি না। অথচ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হবার প্রকৃত কারণটা আমাদের সামনে স্পষ্ট হলে তথা বেশি বেশি খাওয়া, মুটিয়ে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমহীন থাকার কারণে ডায়াবেটিস হয়, এই সত্যটা আমাদের উপলব্ধিতে এলে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ করা আমাদের পক্ষে সহজ ও সম্ভব হতো। একটা ঘটনা উল্লেখ করছি।
আমার যে সহকর্মীর চার বোনের মধ্যে তিনজনেরই ডায়াবেটিস, তাঁর নাম নাজনীন আক্তার। তাঁর ভাই মাত্র একজন। তিনি প্রায়ই কথায় কথায় বলেন, ‘আমার অন্য তিন বোনের সবাই ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আমিও মনে হয় যে কোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারি।’ একদিন এমন কথা বলাতে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেন এমনটা মনে করছেন?’ তিনি বলেন, ‘আমার মায়েরও ডায়াবেটিস ছিল।’ আমি বলি, ‘তাতে কী হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘আমার বোনেরা ডাক্তারের কাছে গেলে ডাক্তার প্রথমেই জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার বাবা-মা কারো কি ডায়াবেটিস ছিল?’ আমার বোনেরা ‘হ্যাঁ’ বলার পর ডাক্তার বলেন, ‘আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকাতেই আপনাদের ডায়াবেটিস হয়েছে।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ভাইও কি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত?’ তিনি বলেন, ‘না’।
আমি বললাম, ‘তাহলে আপনার এবং আপনার ভাইয়ের ডায়াবেটিস নেই কেন? বংশগত হলে তো কেউ বাকি থাকতো না। আরেকটা বিষয় ভেবে দেখুন, ডাক্তাররা বলছেন, আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকাতে আপনার বোনেরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছে। একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনার নানী বা নানার ডায়াবেটিস ছিল কিনা? যদি না থাকে, তাহলে আপনার মায়ের ডায়াবেটিস হলো কোত্থেকে? শুধু ডাক্তারের কথার কারণেই আপনার মনে এখন ভয় কাজ করছে এই ভেবে, আপনি যে কোনো সময় ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারেন।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বংশগত হলে আপনার বোনেরা জন্মের সময়ই শরীরে ডায়াবেটিস নিয়েই জন্মগ্রহণ করতেন এবং তা তখনই, যখন আপনার বোনদের জন্মের আগ থেকেই আপনার মায়ের ডায়াবেটিস থাকতো। দেখা গেছে, আপনারা সব ভাই-বোন জন্মগ্রহণ করার অনেক বছর পর আপনার মায়ের বয়স যখন ৫০-৬০ বছর এবং আপনার বোনদের বয়স ৪০-৪৫ বছর হয়ে গেছে, তখন আপনার মা এবং আপনার বোনেরা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়েছেন। আপনার বোনদের জন্মের অনেক বছর পর আপনার মায়ের শরীরে সৃষ্টি হওয়া ডায়াবেটিস কিভাবে ৪০-৪৫ বছর বয়সী আপনার বোনদের শরীরে সংক্রমিত হলো, ডাক্তার কি সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে?’
টেনশনের সাথে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক
ডায়াবেটিসের কারণ সম্পর্কে আমরা এতটাই অসচেতন যে, অনেক ডায়াবেটিস রোগী যখন দেখেন অন্য সবাই ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ মনে করছেন, তখন তিনি নিজের বাবা-মা বা বংশের কারো মধ্যে এ রোগের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে ধরে নেন, না, এ রোগ বংশগত নয়; বরং আমি যে বিভিন্ন সময় টেনশন করে থাকি, সেই টেনশন থেকেই হয়তো রোগটির জন্ম। নিজের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক অবস্থা কোনোটার দিকেই লক্ষ্য না করে টেনশনকে এ রোগের জন্য দায়ী করে বসেন। অথচ টেনশনও কখনো ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী নয়। দায়ী হচ্ছে বেশি খাওয়া, কায়িক শ্রম কম করা বা না করা, শরীরে কোলেস্টেরল কিংবা চর্বি বেড়ে যাওয়া।
কিন্তু আমরা ডায়াবেটিসের প্রকৃত কারণ না জেনে অবাস্তব সব কারণকে ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী মনে করার ফলে ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা যেমন আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও আমরা অনেকে তা নিয়ন্ত্রণের সঠিক পন্থা সম্পর্কে থাকি বিভ্রান্তিতে।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া প্রায় সব মানুষের মধ্যে বেশি খাওয়ার প্রবণতা, শারীরিক স্থুলতা, আরামপ্রিয়তা বা পরিশ্রমহীনতা এসব সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যাবার পরও দু’একজন ডায়াবেটিস রোগীকে যখন দেখি, তার জীবনে টেনশন বেশি, তখন হুট করে মন্তব্য করে বসি, টেনশন থেকেই ডায়াবেটিস হয়। জ্ঞানের এমন সংকীর্ণতা আমাদের খুব বেশি ক্ষতি করছে।
ডায়াবেটিসের কারণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রসঙ্গে
২৮ আগস্ট ২০১৮ সংখ্যা প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় “জন্ম-ওজন কম হলে পরিণত বয়সে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি” শিরোনামে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় কম জন্ম-ওজন ও তার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিয়ে চীনের করা এক গবেষণার তথ্য অনুসারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের গবেষণা নিবন্ধটি ২২ আগস্ট ২০১৮ অস্ট্রেলিয়ার জার্নাল অব ডায়াবেটিস-এ ছাপা হয়েছে।
চীনের সাংহাইয়ের ১১ হাজার ৫১৫ জন পুরুষ ও ১৩ হাজার ৫৬৯ জন নারীর ওপর এই গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফল হিসেবে গবেষকরা বলেন, ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আর বয়স্ক হলে এদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতাও বেশি দেখা যায়।’
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। পুরুষদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৭৪ বছর। এসব নারী-পুরুষের একটি বড় অংশ ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী চীনা দুর্ভিক্ষের সময় বা তার পরপর জন্মগ্রহণ করেন। এসব নারী-পুরুষের কাছ থেকে তাঁদের জন্ম-ওজন, শিশু বয়সে বুকের দুধ খাওয়ার অভ্যাস, জীবনচর্চার ধরন, খাদ্যাভ্যাস, কায়িক শ্রমের অভ্যাস, পেশাগত ইতিহাস ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।
গবেষকরা দেখেছেন, ‘কম ওজন নিয়ে যেসব নারী-পুরুষ জন্মেছিলেন, প্রাপ্ত বয়সে তাঁদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ সঠিক ওজন নিয়ে জন্মানো নারী-পুরুষের চেয়ে বেশি।’
তবে গবেষণাটির ফলাফলে গবেষকরা আরও একটি কথা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘জীবনের শুরুর দিকের পুষ্টি-পরিস্থিতি পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই।’
গবেষকদের এ সরল স্বীকারোক্তিই গবেষণার ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই উক্তিটি গবেষণার ফলাফলের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। জীবনের শুরুর দিকের পুষ্টি-পরিস্থিতি সব সময় না হলেও অনেক সময় পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। অনেক মানুষ আছে, শৈশবেও হালকা-পাতলা, পরিণত বয়সেও হালকা-পাতলাই থাকে। অনেককে দেখা যায়, শৈশবে যেমন মোটা, পরিণত বয়সেও মোটাই থাকে। এই হিসেবে এবং গবেষণার ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’ এই অনুসিদ্ধান্তমতে, শৈশবে যারা অপুষ্টিতে ভুগেছে তথা হালকা-পাতলা ছিল, তারা পরিণত বয়সে হালকা-পাতলা তথা স্থূল না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু গবেষণাটি এক্ষেত্রে বলছে, শৈশবে যারা অপুষ্টিতে ভুগেছে, পরিণত বয়সে তারা স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে! যদি ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’- এই কথাটি সত্য হয়, তাহলে ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে’- এই কথাটি সত্য হয় কী করে!
কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল না হবার সম্ভাবনাই বেশি। এটা অনেক সময় বংশগত কারণে হয়। বংশগত কারণে অনেকে চিকন, অনেকে মোটা হতে দেখা যায়। তবে ব্যতিক্রম ঘটনারও অভাব নেই। দেখা যায়, শৈশবে মোটা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে শারীরিক পরিশ্রমের কাজে বেশি বেশি লিপ্ত থাকতে হওয়ায় অনেকে চিকন হয়ে যায়। অনেকে আবার শৈশবে চিকন থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা আরামদায়ক পেশায় যুক্ত থাকার কারণে মোটা হয়ে যায়। তাই ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’- কথাটিই সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় এবং ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে’- কথাটি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
খুব কাছের একটার উদাহরণ না দিয়ে পারছি না। আমি এবং আমার মেঝো ভাই উভয়ে শৈশবে চিকন ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে একসময় আমার মেঝো ভাই স্থূল হয়ে যান এবং আমি চিকনই থেকে যাই এখনো। আমার মেঝো ভাই এখন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অথচ রোগগুলো এখনো আমাকে আক্রমণ করেনি। আমার মেঝো ভাই স্থূল হয়ে যাবার কারণ প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এখনো সেরকম কোনো কারণ ঘটেনি বলে আমি স্থূল হবার সুযোগ পাইনি। আর স্থূল হবার সুযোগ পাইনি বলেই এবং আরামপ্রিয় জীবন বেছে নিইনি বলেই হয়তো রোগগুলো আমাকে এখনো স্পর্শ করার সুযোগ পায়নি। আমাদের দু’জনকে রোগগুলো আক্রমণ করা-না করার সাথে জন্মের সময় আমাদের ওজন কম-বেশ থাকার কি কোনো সম্পর্ক আছে?
আমার বিশ্বাস, এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে হাত বাড়ালেই, যেগুলো প্রমাণ করবে, পরিণত বয়সে ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা উচ্চ রক্তচাপের সাথে জন্মগত ওজনের কোনো সম্পর্ক নেই।
জন্মগতভাবে কেউ স্থূল না হলেও পরিণত বয়সে যদি সে শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে থাকে, ভোজনরসিক হয়, তাহলে তার স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি খুবই বেশি। পক্ষান্তরে জন্মগতভাবে কেউ স্থূল হলেও পরিণত বয়সে সে যদি বেশি বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সাথে জড়িত থাকে, পরিমিত খায়, তার স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি একেবারে কম। আমার ভিন্নমতটা নিয়ে নতুন করে সঠিক পন্থায় গবেষণা করলে আমার বিশ্বাস, গবেষণাটি সম্পর্কে আমার ভিন্নমতটাই শতভাগ সঠিক বলে প্রমাণিত হবে।
ডায়াবেটিসের কারণ সম্পর্কে আমরা এতটাই অসচেতন যে, অনেক ডায়াবেটিস রোগী যখন দেখেন অন্য সবাই ডায়াবেটিসকে বংশগত রোগ মনে করছেন, তখন তিনি নিজের বাবা-মা বা বংশের কারো মধ্যে এ রোগের অস্তিত্ব খুঁজে না পেয়ে ধরে নেন, না, এ রোগ বংশগত নয়; বরং আমি যে বিভিন্ন সময় টেনশন করে থাকি, সেই টেনশন থেকেই হয়তো রোগটির জন্ম। নিজের জীবনযাত্রা, খাদ্যাভ্যাস বা শারীরিক অবস্থা কোনোটার দিকেই লক্ষ্য না করে টেনশনকে এ রোগের জন্য দায়ী করে বসেন। অথচ টেনশনও কখনো ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী নয়। দায়ী হচ্ছে বেশি খাওয়া, কায়িক শ্রম কম করা বা না করা, শরীরে কোলেস্টেরল কিংবা চর্বি বেড়ে যাওয়া।
কিন্তু আমরা ডায়াবেটিসের প্রকৃত কারণ না জেনে অবাস্তব সব কারণকে ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী মনে করার ফলে ডায়াবেটিস থেকে মুক্ত থাকা যেমন আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেও আমরা অনেকে তা নিয়ন্ত্রণের সঠিক পন্থা সম্পর্কে থাকি বিভ্রান্তিতে।
পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া প্রায় সব মানুষের মধ্যে বেশি খাওয়ার প্রবণতা, শারীরিক স্থুলতা, আরামপ্রিয়তা বা পরিশ্রমহীনতা এসব সাধারণ বৈশিষ্ট্য দেখা যাবার পরও দু’একজন ডায়াবেটিস রোগীকে যখন দেখি, তার জীবনে টেনশন বেশি, তখন হুট করে মন্তব্য করে বসি, টেনশন থেকেই ডায়াবেটিস হয়। জ্ঞানের এমন সংকীর্ণতা আমাদের খুব বেশি ক্ষতি করছে।
ডায়াবেটিসের কারণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রসঙ্গে
২৮ আগস্ট ২০১৮ সংখ্যা প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় “জন্ম-ওজন কম হলে পরিণত বয়সে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি” শিরোনামে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় কম জন্ম-ওজন ও তার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী অসংক্রামক রোগের সম্পর্ক নিয়ে চীনের করা এক গবেষণার তথ্য অনুসারে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের গবেষণা নিবন্ধটি ২২ আগস্ট ২০১৮ অস্ট্রেলিয়ার জার্নাল অব ডায়াবেটিস-এ ছাপা হয়েছে।
চীনের সাংহাইয়ের ১১ হাজার ৫১৫ জন পুরুষ ও ১৩ হাজার ৫৬৯ জন নারীর ওপর এই গবেষণা করা হয়। গবেষণার ফল হিসেবে গবেষকরা বলেন, ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। আর বয়স্ক হলে এদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রবণতাও বেশি দেখা যায়।’
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে। পুরুষদের বয়স ছিল ৪০ থেকে ৭৪ বছর। এসব নারী-পুরুষের একটি বড় অংশ ১৯৫৯ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী চীনা দুর্ভিক্ষের সময় বা তার পরপর জন্মগ্রহণ করেন। এসব নারী-পুরুষের কাছ থেকে তাঁদের জন্ম-ওজন, শিশু বয়সে বুকের দুধ খাওয়ার অভ্যাস, জীবনচর্চার ধরন, খাদ্যাভ্যাস, কায়িক শ্রমের অভ্যাস, পেশাগত ইতিহাস ও দীর্ঘস্থায়ী রোগের তথ্য সংগ্রহ করেন গবেষকেরা।
গবেষকরা দেখেছেন, ‘কম ওজন নিয়ে যেসব নারী-পুরুষ জন্মেছিলেন, প্রাপ্ত বয়সে তাঁদের মধ্যে স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ সঠিক ওজন নিয়ে জন্মানো নারী-পুরুষের চেয়ে বেশি।’
তবে গবেষণাটির ফলাফলে গবেষকরা আরও একটি কথা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘জীবনের শুরুর দিকের পুষ্টি-পরিস্থিতি পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই।’
গবেষকদের এ সরল স্বীকারোক্তিই গবেষণার ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই উক্তিটি গবেষণার ফলাফলের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। জীবনের শুরুর দিকের পুষ্টি-পরিস্থিতি সব সময় না হলেও অনেক সময় পরবর্তী জীবনে প্রভাব ফেলে। অনেক মানুষ আছে, শৈশবেও হালকা-পাতলা, পরিণত বয়সেও হালকা-পাতলাই থাকে। অনেককে দেখা যায়, শৈশবে যেমন মোটা, পরিণত বয়সেও মোটাই থাকে। এই হিসেবে এবং গবেষণার ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’ এই অনুসিদ্ধান্তমতে, শৈশবে যারা অপুষ্টিতে ভুগেছে তথা হালকা-পাতলা ছিল, তারা পরিণত বয়সে হালকা-পাতলা তথা স্থূল না হবার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু গবেষণাটি এক্ষেত্রে বলছে, শৈশবে যারা অপুষ্টিতে ভুগেছে, পরিণত বয়সে তারা স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে! যদি ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’- এই কথাটি সত্য হয়, তাহলে ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে’- এই কথাটি সত্য হয় কী করে!
কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল না হবার সম্ভাবনাই বেশি। এটা অনেক সময় বংশগত কারণে হয়। বংশগত কারণে অনেকে চিকন, অনেকে মোটা হতে দেখা যায়। তবে ব্যতিক্রম ঘটনারও অভাব নেই। দেখা যায়, শৈশবে মোটা ছিল, কিন্তু পরবর্তীতে শারীরিক পরিশ্রমের কাজে বেশি বেশি লিপ্ত থাকতে হওয়ায় অনেকে চিকন হয়ে যায়। অনেকে আবার শৈশবে চিকন থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন বা আরামদায়ক পেশায় যুক্ত থাকার কারণে মোটা হয়ে যায়। তাই ‘জন্মের সময় ওজন কম হলে পরবর্তী জীবনে শারীরিক গঠন কী হবে, তার কোনো সরল উত্তর নেই’- কথাটিই সঠিক বলে প্রতীয়মান হয় এবং ‘কম ওজন নিয়ে জন্ম নেওয়া শিশুরা পরিণত বয়সে স্থূল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে’- কথাটি বাস্তবতার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
খুব কাছের একটার উদাহরণ না দিয়ে পারছি না। আমি এবং আমার মেঝো ভাই উভয়ে শৈশবে চিকন ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে একসময় আমার মেঝো ভাই স্থূল হয়ে যান এবং আমি চিকনই থেকে যাই এখনো। আমার মেঝো ভাই এখন ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অথচ রোগগুলো এখনো আমাকে আক্রমণ করেনি। আমার মেঝো ভাই স্থূল হয়ে যাবার কারণ প্রথম অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এখনো সেরকম কোনো কারণ ঘটেনি বলে আমি স্থূল হবার সুযোগ পাইনি। আর স্থূল হবার সুযোগ পাইনি বলেই এবং আরামপ্রিয় জীবন বেছে নিইনি বলেই হয়তো রোগগুলো আমাকে এখনো স্পর্শ করার সুযোগ পায়নি। আমাদের দু’জনকে রোগগুলো আক্রমণ করা-না করার সাথে জন্মের সময় আমাদের ওজন কম-বেশ থাকার কি কোনো সম্পর্ক আছে?
আমার বিশ্বাস, এরকম আরো অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাবে হাত বাড়ালেই, যেগুলো প্রমাণ করবে, পরিণত বয়সে ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা উচ্চ রক্তচাপের সাথে জন্মগত ওজনের কোনো সম্পর্ক নেই।
জন্মগতভাবে কেউ স্থূল না হলেও পরিণত বয়সে যদি সে শারীরিক পরিশ্রম থেকে দূরে থাকে, ভোজনরসিক হয়, তাহলে তার স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি খুবই বেশি। পক্ষান্তরে জন্মগতভাবে কেউ স্থূল হলেও পরিণত বয়সে সে যদি বেশি বেশি শারীরিক পরিশ্রমের সাথে জড়িত থাকে, পরিমিত খায়, তার স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি একেবারে কম। আমার ভিন্নমতটা নিয়ে নতুন করে সঠিক পন্থায় গবেষণা করলে আমার বিশ্বাস, গবেষণাটি সম্পর্কে আমার ভিন্নমতটাই শতভাগ সঠিক বলে প্রমাণিত হবে।
এই নিবন্ধ ভিন্ন কোনো নিবন্ধ নয়। একটি বইয়ের অংশ মাত্র। বইটি মাত্র ৫ পর্বে পড়া যাবে অনলাইনে। বইটি হচ্ছে: দীর্ঘজীবন লাভের উপায়
দীর্ঘজীবন লাভের উপায়
শিরোনামে এইটি বই পড়ুন সম্পূর্ণ অনলাইনে, ঘর শুয়ে-বসে। বইটি পড়লে আপনি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হার্ট অ্যাটাক এই তিনটি গুরুতর রোগের সঠিক কারণ এবং এই তিনিটি রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার সঠিক উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
Comments
Post a Comment