কথাটা শুনে অবাক লাগছে? কেন অবাক লাগছে? আমরা কি দেখতে পাচ্ছি না, আমাদের পরিচিত অনেক মানুষ, আমাদের অনেক আত্মীয় বা প্রতিবেশি গত কয়েক বছরে ৩৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যেই মারা গেছেন?
আমার পরিচিত অনেক অনেক মানুষ গত কয়েক বছরে এরকম অল্প বয়সেই মারা গেছেন। লিটন নামে আমার এক মামা হুট করে মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে, যার প্রথম সন্তান তখন মাত্র নবম শ্রেণিতে ছিল। আমার ছোট বোনের ননদের স্বামী বছর চারেক আগে সৌদি আরবে মারা গেছেন, যখন তার একমাত্র সন্তানের বয়স ছিল মাত্র ২ বছরের মতো! আর বড় বোনের এক দেবর এবং এক ভাসুর মারা গেছেন তিন-চার বছর আগে, যারা কর্মসূত্রে মধ্যপ্রাচ্যে কাটিয়েছেন অনেক বছর। তাঁরা উভয়ে মারা গেছেন ৫৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যেই। আমাদের স্কুলের তাসলিমা নামক এক শিক্ষার্থীর বাবা গত বছর সৌদি আরবে মারা গেছেন, যার প্রথম সন্তান তখন মাত্র ক্লাস নাইনে ছিল।
আমার মেঝো জেঠার প্রথম ছেলেও সৌদি আরবে মারা গেছেন, যার বয়স ৫৫ বছরের মতো ছিল। এভাবে আমার পরিচিত অনেকের কথা উল্লেখ করা যাবে, কিন্তু সেগুলো বলে লাভ হবে না। কারণ আমি বানিয়ে বানিয়েও বলতে পারি। যারা আমাকে চেনেন, শুধু তারাই বিশ্বাস করবেন। এরকম উদাহরণ দেয়াকে আমার কাছে সঠিক মনে হয় না। এর পরিবর্তে আমি সবাইকে একটু খুঁজে দেখার অনুরোধ করছি, দেখুন আপনার পরিচিত এমন অনেক লোক গত কয়েক বছরে মারা গেছেন, যাদের বয়স ছিল ৩৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে। সবাই এমন অনেক লোক খুঁজে পাবেন তার পরিচিতজনদের মধ্যে। কারণ এরকম অপমৃত্যু বা অকালমৃত্যু আমার বা আপনার এলাকাতেই শুধু ঘটছে না, ঘটছে বিশ্বব্যাপী।
জাপান সহ অল্প কিছু দেশে মানুষের গড় আয়ু বেশি, এই রকম অল্প কয়টি দেশ ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব দেশে মানুষ এখন বেশি দিন বেঁচে থাকার সুযোগ পাচ্ছে না। মারা যাচ্ছে অকালে, মারা যাচ্ছে ৬০ বছর বয়স হতে না হতেই।
কেন? মানুষের মৃত্যু কেন এতো নিকটে চলে এসেছে? মানুষের জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে কেন?
আজ থেকে ৬০-৭০ বছর আগেও অনেক অনেক মানুষ ৮০ থেকে ১০০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকতো। এখন কেন ৩৫ থেকে ৬০ বছরের মধ্যেই জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে? বড়জোর ৭০ বছরের মতো জীবন পাচ্ছে অধিকাংশ মানুষ। কেন?
অনেকেই অনেক কারণ বলবেন। অনেকে বলবেন আগের কালের মানুষ ভালো ভালো খাবার খেতো, তাজা এবং ক্যামিকেলবিহীন খাবার খেতো, এজন্য বেশি দিন বেঁচে থাকার সুযোগ পেতো। কিন্তু এখন অধিকাংশ খাদ্য হাইব্রিড, আগের মতো নির্ভেজাল এবং তাজা খাবার খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না মানুষ এখন। খাদ্যের সাথে মেশানো হয় নানা ধরনের ক্যামিকেল। তাই এখনকার মানুষ বেশি দিন জীবন পাচ্ছে না।
মানুষের এই মন্তব্যগুলো সঠিক নাকি ভুল, তা না বলে আগে আমরা দেখি, এখন যারা ৬০ বছরের আগে মারা যাচ্ছে, তারা বেশিরভাগ কোন রোগে আক্রান্ত হয়ে বা কোন রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে। গত কয়েক বছরে আপনার পরিচিত যারা ৬০ বছরের আগে মারা গেছে বা ৭০ বছরের আগে মারা গেছে, আপনি তাদের খোঁজ নিয়ে দেখুন, আপনি অবাক হয়ে দেখবেন তাদের বেশিরভাগই মারা গেছে হার্ট অ্যাটাকে (হৃদরোগ)। কেউ কেউ মারা গেছে ডায়াবেটিসে, খুব অল্প পরিমাণে মানুষ মারা গেছে ক্যান্সার এবং ব্রেইন স্ট্রোকে।
একটা কথা বলে রাখা দরকার, এই মৃত্যুর পরিসংখ্যানে কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। কারণ সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিটা দেশেই কমবেশি হচ্ছে। তাছাড়া আপনার এলাকায় এখন থেকে পরবর্তী এক বছর যে লোকগুলো মারা যাবে, দেখবেন তাদের খুব অল্প সংখ্যকই সড়ক বা অন্য কোনো দুর্ঘটনায় মারা গেছে। তাই সড়ক দুর্ঘটনাসহ সব ধরনের দুর্ঘটনায় মৃত্যুকে আলাদা রাখতে হবে। কারণ সেগুলো একেবারেই দুর্ভাগ্যজনক।
বিশ্বাস করুন, আর না-ই করুন, একটু আগে ৩৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী যে লোকগুলোর মৃত্যুর কথা আমি উল্লেখ করেছি, তাদের প্রায় সবাই মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাকে। আমার পরিচিত আরো অনেকের মৃত্যুকে এই তালিকায় উল্লেখ করার সুযোগ আছে, যারা অল্প বয়সে মারা গেছেন এবং মারা গেছেন হার্ট অ্যাটাকে।
কিন্তু আমার মনে হয়, সবাই নিজে নিজে নিজের আশপাশ থেকে উদাহরণ খুঁজে নিলেই ভালো। তাহলে আমার উদাহরণে বিশ্বাস করার প্রয়োজন হবে না (যারা আমাকে চেনেন না তারা)। সবার আশপাশেই এরকম ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গত কয়েক বছর বা কয়েক যুগ ধরে কেন মানুষ বেশি বেশি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হচ্ছে? টেনশনে? কেন এখন অনেক অনেক মানুষকে ৩৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের মধ্যেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হচ্ছে শুধুই হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে? ভেজালযুক্ত এবং হাইব্রিড খাবার খেয়ে খেয়ে? নাকি অতিমাত্রায় টেনশনে ভুগে?
মোটেই না। কারণ যেসব দেশে খাদ্যে ভেজাল দেয়া হয় না, যেসব দেশের মানুষ তুলনামূলক বেশি সুখে জীবন কাটায়, সেসব দেশেও মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। পৃথিবীতে কি এমন কোনো দেশ আছে, যেখানে মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয় না, মারা যায় না?
মূলত মানুষ যখন আরামে থাকতে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে, যখন মনের পছন্দমতো খেতে পারে, তখন মানুষ মুটিয়ে যায় এবং মানুষের শরীরে চর্বি-কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। সেই চর্বি কোলেস্টেরলের আতুড়ঘরে প্রথমে জন্ম নেয় উচ্চ রক্তচাপ, পরে উচ্চ রক্তচাপের উপযুক্ত চিকিৎসা না করার ফলে কখনো টেনশন বেড়ে গিয়ে বা উচ্চ রক্তচাপের জন্য ক্ষতিকর, এমন কোনো খাবার খেলে মানুষের শরীরে বিদ্যমান রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে মানুষের হার্ট ব্লক হয়ে মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়। হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়ে অনেকে প্রথমবারেই মারা যায়। কেউ কেউ প্রথমবারে মারা না গেলেও দ্বিতীয় কি তৃতীয়বারের হার্ট অ্যটাকে মারা যায়।
আপনি হার্ট অ্যাটাকের জন্য কেন টেনশনকে দায়ী করবেন শুধু শুধু?
আগেকার সময়ে তো মানুষ আরো বেশি অভাবী ছিল, তাদের টেনশনও ছিল বেশি, তখন মানুষ হার্ট অ্যাটাকে এতো বেশি আক্রান্ত হতো না কেন? এখন অনেক অনেক পয়সাঅলা মানুষও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয় কেন? এসব পয়সাঅলা সবাই কি টেনশনে টেনশনেই দিন কাটায়?
আগের মানুষ নানাভাবে শারীরিক পরিশ্রম করতো, পায়ে হেঁটেই অনেক দূরের পথ পাড়ি দিতে হতো, এভাবে নিয়মিত কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করার ফলে মানুষের শরীরে চর্বি-কোলেস্টেরল বৃদ্ধির সুযোগই হতো না। কিভাবে মানুষের হার্ট ব্লক্ড হবে? তাছাড়া মানুষের যদি উচ্চ রক্তচাপ না থাকে, তখন যত টেনশন করুক, তার রক্তচাপও বাড়বে না, হার্ট ব্লক্ডও হবে না। এজন্য আগেকার মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতো একেবারে কম।
এখনও যারা পেশাগত কারণে বা উদ্দেশ্যমূলকভাবেই নিয়মিত কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করে, তারা এরকম কোনো রোগে আক্রান্ত হয় না মোটেই।
তাই ব্যায়ামে বা যে কোনো শারীরিক পরিশ্রমে দৈনিক অন্তত ৪০ মিনিট সময় দিন, ৬০ বছরের চেয়ে অনেক বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রবল হবে।
দীর্ঘজীবন লাভের উপায় শিরোনামে এইটি বই পড়ুন সম্পূর্ণ অনলাইনে, ঘর শুয়ে-বসে। বইটি পড়লে আপনি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং হার্ট অ্যাটাক এই তিনটি গুরুতর রোগের সঠিক কারণ এবং এই তিনিটি রোগ থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখার সঠিক উপায় সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারবেন।
Comments
Post a Comment