উচ্চ রক্তচাপ থেকে কি স্ট্রোক হয়, নাকি হার্ট অ্যাটাক?
২২ নভেম্বর ২০২০ তারিখ সকালে এক দোকানে বসে গল্প করছিলাম এলাকার পরিচিত দু’তিনজন মানুষের সাথে। মিঠু নামে আমার এক ভাতিজার অসুস্থতার কথা কথা আলোচনায় আসতেই আরেকজন বললো আমাদের এলাকার খোকন নামক একজনের হঠাৎ অসুস্থতার কথা। আমি বললাম, ‘খোকন যেহেতু আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ এবং ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, তিনি এখন যে কোনো সময় রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হতে পারেন।’ আমার কথাকে প্রত্যাখ্যান করে একজন বললো, ‘উচ্চ রক্তচাপের কারণে মানুষ হার্ট অ্যাটাক নয়, বরং ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়।’ আমি তাঁকে বললাম, ‘আমি যা জানি, তা আমি বলেছি। আপনি যা জানেন, তা-ই আপনি বলেছেন।’ তিনি এবার বললেন, ‘মানুষ স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তখন, যখন তার রক্তচাপ বেড়ে যায়। আর মানুষ হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয় তখন, যখন কোনো বিষয় নিয়ে বেশি বেশি টেনশন করে।’
আমাদের সমাজে এবং বিশ^ব্যাপী এই ধারণা ছড়িয়ে আছে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা রক্তচাপ বেড়ে যাবার কারণে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়, হার্ট অ্যাটাকে নয়। কথাটিকে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে দেখলে পরিষ্কার হবে, এটি কতটুকু বাস্তবসম্মত।
আপনার পরিচিত হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত ২০ জন লোকের সাথে আলাপ করে দেখুন, তারা হৃদরোগে আক্রান্ত হবার আগে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিল কিনা? দেখবেন তারা সবাই হৃদরোগে আক্রান্ত হবার আগে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিল। এবার স্ট্রোকে আক্রান্ত ২০ জন লোকের খোঁজ নিন। দেখবেন তাদের মধ্যে ২৫ শতাংশও স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার আগে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ছিল না।
বিষয়টা আমি কিভাবে নিশ্চিত হলাম? কারণ আমিও এভাবে বিষয়টা যাচাই করে দেখেছি।
আপনি যদি ‘২০ বছর ধরে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত’ এমন ১০০ জন লোকের খোঁজ নেন, দেখবেন, তাদের ৪০ শতাংশেরও বেশি লোক হৃদরোগে আক্রান্ত। কিন্তু ৫ শতাংশও স্ট্রোকে আক্রান্ত নয়। এর কারণ উচ্চ রক্তচাপ যে কারণে হয়, হৃদরোগও সেই কারণেই হয়। মানুষ যখন আরামে আরামে থাকে, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করে, বেশি বেশি খায় তখন তার শরীরে চর্বি বেড়ে গিয়ে সে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ না করলে সেই চর্বি আরো বেড়ে গিয়ে তার হার্টের রক্ত সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হবার ফলে তার হার্ট ব্লক্ড হয়ে সে হার্ট অ্যাটাকে (হৃদরোগ) আক্রান্ত হয়ে পড়ে। আর স্ট্রোকের কোনো সুস্পষ্ট কারণ এখনো পরিষ্কার হয়নি। টেনশনে ভোগা মানুষ যেমন স্ট্রোক করে, টেনশনে না ভোগা মানুষও স্ট্রোক করে; উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষ যেমন স্ট্রোক করে, উচ্চ রক্তচাপে যারা আক্রান্ত নয়, তারাও অহরহ স্ট্রোক করে; ধূমপানে আসক্তরা যেমন স্ট্রোক করে, ধূমপানে যারা অভ্যস্থ নয়, তারাও স্ট্রোক করে; পুরুষরা যেভাবে স্ট্রোক করে; মহিলারাও (মহিলারা অনেক দেশ খুব কম ধূমপান করে) সেভাবে স্ট্রোক করে। স্ট্রোকের কারণ অনেকটাই অজানা। স্ট্রোকের কারণ নিয়ে তাই এখনো কোনো মন্তব্য করা ঠিক নয়।
অন্যদিকে হৃদরোগের কারণ স্পষ্ট। সাধারণত উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত মানুষরাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়, স্ট্রোকে নয়। এ সম্পর্কে বিভ্রান্তির অবসান হওয়া দরকার।
‘বাংলাদেশ প্রতিদিনে’ ১১ মে ২০১৯ তারিখে ‘চারজনে তিনজন হৃদরোগ ঝুঁকিতে’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে (তৈরি করেছেন শামীম আহমেদ ও জয়শ্রী ভাদুড়ী) বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়সীর মধ্যে তিনজনের হৃদরোগ ঝুঁকি রয়েছে। হৃদরোগের অন্যতম কারণ উচ্চ রক্তচাপ।’’
‘উচ্চ রক্তচাপে কেন ওষুধ ব্যর্থ হয়’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় দৈনিক কালের কণ্ঠে ২৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে। সেখানে বলা হয়, ‘সারা বিশ্বে মানুষের একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় এখন হৃদরোগ। যদি আপনার উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে আপনাকে এই রোগের বিপদ সম্পর্কে নিশ্চয়ই চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন।
উচ্চ রক্তচাপে রক্তনালীর বেষ্টনীর বিরুদ্ধে রক্তের চাপ খুব বেশি হয়। ফলে হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালীকে বাড়তি কাজ করতে হয়। এতে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’
বাংলাদেশ প্রতিদিনে ১৯ মে ২০১৮ তারিখে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘উচ্চ রক্তচাপ : নীরব ঘাতক’ শিরোনামে, যা লিখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক ও ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘দিন দিন উচ্চ রক্তচাপ মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অঙ্গে মারাত্মক ধরনের জটিলতা হতে পারে। যেমন— হৃৎপিন্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং এই অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর।’
এককথায় হৃদরোগ হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ থেকে, স্ট্রোক নয়। স্ট্রোকের কারণ যেহেতু এখনো পরিষ্কার নয়, তাই স্ট্রোক প্রতিরোধ সম্ভব না হলেও হার্ট অ্যাটাক বা হৃদরোগ প্রতিরোধে পুরোপুরি সম্ভব।
আসুন, আমরা আর বিভ্রান্তিতে না ভুগে হার্ট অ্যাটাকের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সচেতন হই এবং হার্ট অ্যাটাক থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ রাখার জন্য দৈনিক অন্তত ৪০ মিনিট যে কোনোভাবে কঠোর শারীরিক পরিশ্রম করি।
Comments
Post a Comment