যারা দৈনিক পত্রিকা পড়েন, তারা জানেন, দেশের কোনো না কোনো স্থানে প্রায় প্রতিদিন কাভারবিহীন তারের সংস্পর্শে গিয়ে বা কাভারবিহীন তারে জড়িয়ে অনেক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, অনেকে মারাত্মকভাবে আহত হচ্ছে, অনেকে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে সারাজীবনের জন্য। কখনো কখনো এসব কাভারবিহীন তারের সংস্পর্শে এসে একজন নয়, দু-তিনজন মানুষও একইসাথে প্রাণ হারাচ্ছে। ‘লোহাগাড়ায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মা-মেয়ের মৃত্যু’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় দৈনিক কালের কন্ঠে ১৮ আগস্ট, ২০২০ তারিখে। ‘রায়েরবাজারে বিদ্যুতায়িত হয়ে ৩ শ্রমিকের মৃত্যু’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয় প্রথম আলোয় ২২ জানুয়ারি ২০২০ তারিখে। এভাবে একই সাথে একাধিক মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। কিন্তু এখনো এই মৃত্যুগুলো বন্ধ বা হ্রাসের জন্য কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় একই দিনে কখনো কখনো একাধিক দুর্ঘটনা বা মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে।
‘বরিশালে বিদ্যুতায়িত হয়ে তরুণের মৃত্যু’ শিরোনামে দৈনিক নয়াদিগন্তের ২৮ নভেম্বর ২০১৯ সংখ্যার ৬ নং পৃষ্ঠায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘বরিশাল বন্দরথানাধীন টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের বদিউল্লাহ গ্রামে নারকেল পাড়তে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পলাশ হাওলাদার (১৫) নামে এক তরুণের মৃত্যু হয়েছে।’ দৈনিক নয়াদিগন্তের একই সংখ্যার একই পৃষ্ঠায় ‘রাজৈরে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে কিশোরের মৃত্যু’ শিরোনামে প্রকাশিত আরেকটি সংবাদে উল্লেখ করা হয়, ‘মাদারীপুরের রাজৈরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে রুবাই খান (১৫) নামে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। ... পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার পশ্চিম রাজৈর গ্রামের শওকত খানের ছেলে রুবাই খান তার চাচার দোকানের চালের ওপর থেকে লাউপাতা পাড়ার সময় অসাবধানতাবশত বিদ্যুতের তারে আটকে যায়।...’
‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে তিন জেলায় তিন জনের মৃত্যু’ শিরোনামে বাংলা ট্রিবিউনে ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘ঝিনাইদহ, পটুয়াখালী ও নড়াইলে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে তিন ব্যক্তির অপমৃত্যু হয়েছে। সোমবার পৃথক পৃথক সময়ে তিন জেলায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।’ সংবাদটিতে যে তিনটি অপমৃত্যুর কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেই তিনটির দু’টিই সংঘটিত হয়েছে কাভারবিহীন তারের সাথে জড়িয়ে।
কাভারবিহীন তারের অভিশাপে এভাবে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে কত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তার হিসেব কেউ রাখে কিনা, জানি না। তবে যে কেউ গুগলে ‘বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যু’ বা ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু’ বা ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে কৃষকের মৃত্যু’ লিখে সার্চ করলে সার্চ রেজাল্টে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত এরকম মৃত্যুর অসংখ্য সংবাদের লিঙ্ক দেখে সবাই আঁতকে উঠবেন, সন্দেহ নেই। জানি না, এই মৃত্যুর মিছিল আর কতো লম্বা হলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো এবং এই সংক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘুম ভাঙবে! শুধু পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নয়, এই বিষয়ে আরো অনেক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব আছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রনালয়, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এরকম অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কাভারবিহীন তারের কারণে যুগ যুগ ধরে মানুষের মৃত্যুগুলো নিয়ে ভাববার মনে হয় কেউ নেই!
সাধারণ জনগণের মতো কখনো কখনো অনেক বিদ্যুৎকর্মীও বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যাচ্ছে বিদ্যুতের কাজ করার সময়। ‘শেরপুরে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শ্রমিকের মৃত্যু’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোয় ০২ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, ‘বগুড়ার শেরপুর উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের নন্দতেঘরী গ্রামে পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন তারে স্পৃষ্ট হয়ে এক শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।’
‘কেন্দুয়ায় বিদ্যুৎ-কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু’ শিরোনামে দৈনিক কালের কন্ঠে ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত একটি সংবাদে বলা হয়, ‘নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় পল্লী বিদ্যুতের লাইনে কাজ করার সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে নূরুল আলম (২৫) নামে বিদ্যুতের লাইন সম্প্রসারণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার পৌরসভার দিগদাইর এলাকায়। নিহত নূরুল পার্শ্ববর্তী আটপাড়া উপজেলার শ্রীরামপুর-আমাডি গ্রামের আবদুল কুদ্দুছের ছেলে।’ [https://www.kalerkantho.com/online/country-news/2019/09/25/818751]
‘বাগমারায় ভুল সংকেতে বিদ্যুতের পোলে লাইনম্যানের মৃত্যু’ শিরোনামে দৈনিক নতুন সময় পত্রিকায় ২ আগস্ট ২০১৯ তারিখে প্রকাশিত ৈএকটি সংবাদে বলা হয়, ‘রাজশাহীর বাগমারায় বিদ্যুৎ অফিসের ভুল সংকেতে বিদ্যুতের পোলে লাইনম্যানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের কাজ করলেও শেষ রক্ষা হল পেল না রিয়াজ উদ্দীন (৫২) নামের একজন লাইনম্যানের। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলা বাগমারা গ্রামের হঠাৎপাড়ায় পোলে কাজ করা অবস্থায় এ দুর্ঘটনা ঘটে।’ [https://www.notunshomoy.com/details.php?id=31527]
এরকম ঘটনা আরো অনেক আছে। কিন্তু তবু পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর টনক নড়ছে না। তাদের নিকট মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই, তারা বেশি মূল্যবান ভাবছে কাভারযুক্ত তারকে। আমাদের কোনোভাবেই বোধগম্য হচ্ছে না, কাভারযুক্ত তার কিভাবে একজন দু’জন নয়, হাজার মানুষের জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান হতে পারে! যে কোনো সচেতন মানুষ নির্দ্বিধায় স্বীকার করবে, পুরো দেশের সব কাভারবিহীন তারকে কাভারযুক্ত তারে রূপান্তর করতে যত খরচ হবে, একজন সাধারণ মানুষের জীবনের মূল্য তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি। কিন্তু এই বিষয়টা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোসহ বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মাথায় আসছে না কোনোভাবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, মানুষের জীবনকে ওরা গরু-ছাগলের চেয়েও মূল্যহীন ভাবছে।
‘বিদ্যুৎ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বাড়ছে’ শিরোনামে দৈনিক প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ১৪ জুলাই ২০১৮ তারিখে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, ‘দেশে দগ্ধ হয়ে প্রাণহানির প্রায় অর্ধেক ঘটছে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায়। এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মৃত্যুর পাশাপাশি এতে অঙ্গহানির ঝুঁকিও বেশি।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গত বছর বিভিন্নভাবে দগ্ধ রোগীর (বহির্বিভাগে এবং ভর্তি থেকে) চিকিৎসা গ্রহণ, মৃত্যু ও অঙ্গহানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
২০১৭ সালে দগ্ধ হয়ে ৭৫৮ জন মারা যায়। তাদের মধ্যে ৩৬৪ জন মারা যায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, যা মোট মৃত্যুর ৪৮ শতাংশ। এর আগের বছর আগুনে পুড়ে মারা যায় ৭৫৪ জন। তাদের ৪২ শতাংশ মারা যায় বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায়।
বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের জাতীয় সমন্বয়ক সামন্ত লাল সেন বলেন, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনার ক্ষতি ও ভয়াবহতা খুব বেশি। এতে দগ্ধ রোগীর উচ্চ মৃত্যুঝুঁকির পাশাপাশি অঙ্গহানির ঘটনার সম্ভাব্যতার হার অনেক বেশি। এ ধরনের দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়ছে।
বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রিয় দলের পতাকা ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গত ১৫ জুন হাসপাতালে ভর্তি হন রাজধানীর মিরপুরের তৌহিদী মোরশেদ (৪০)। জীবন বাঁচাতে শুরুতে তাঁর দুটি পা হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলা হয়। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২১ দিন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থেকে ৬ জুলাই তিনি মারা যান।
গত বছর বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের বহির্বিভাগে এবং ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৬৫ হাজার। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দগ্ধ ১৭ হাজারের বেশি ছিল। ২০১৬ সালে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দগ্ধের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজারের বেশি।
নীলফামারীর রডমিস্ত্রি সাইফুল ইসলাম (২৬) ময়মনসিংহে একটি ভবন তৈরির কাজ করার সময় অসতর্কতায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন। তাঁর বাঁ হাত, বাঁ পা ও বুকের বেশ খানিকটা অংশ পুড়ে যায়। এখন তিনি বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা যায়, হাত, পা ও বুকে ব্যান্ডেজ করা সাইফুল যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। তাঁর মা নুরুন নাহার বেগম পাশে বসে বাতাস করছেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছেলের এ অবস্থায় মা বলেন, ‘ছেলের চিকিৎসা চালাব না সংসারের কথা চিন্তা করব, বুঝতে পারি না। ছেলে তো আমার চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল।’ বাড়িতে সাইফুলের স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে।
চিকিৎসকেরা বলছেন, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দগ্ধ রোগীর অঙ্গহানির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অনেকে পঙ্গু হয়ে যান। গত বছর এ ধরনের প্রায় ৫০০ রোগীর অঙ্গহানির ঘটনা ঘটেছে। অনেক রোগীর চার হাত-পায়ের মধ্যে তিনটিই কাটা পড়েছে। ২০১৬ সালে অঙ্গহানির সংখ্যা ছিল ২০০-এর কম।
ডাম্পিং ট্রাকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন ১৮ বছরের মো. শরীফ। বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় পুড়ে চার মাসের বেশি এই হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
শরীফ জানান, রাতে কাজ শেষ করে ট্রাক নিয়ে স্ট্যান্ডে ফেরার সময় একটি নিচু হয়ে ঝুলে থাকা বৈদ্যুতিক তার সরাতে যান তিনি। এ সময় হঠাৎ আসা বাতাসে তারটি শরীরে লাগে। এতে তাঁর শরীরের পিঠ থেকে নিচের দিকে ৬৭ শতাংশ পুড়ে যায়। শরীরের অনেক জায়গায় গভীর ক্ষত। শরীফ বলেন, এখন পর্যন্ত তাঁর শরীরে চার বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিৎসকেরা বাঁ পা বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের দুর্ঘটনা ও উদ্ধারের পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, তারা ২০১৬ সালে প্রায় ১৭ হাজার অগ্নিকান্ড নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর প্রায় ৭০ শতাংশ অগ্নিকান্ড বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট।’
এটা ঠিক, বিদ্যুৎকে কোনোভাবে শতভাগ নিরাপদ করা যাবে না। কিন্তু কাভারবিহীন তার ব্যবহারের কারণে যে হারে দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে, কাভারবিহীন তার ব্যবহার না করে শুরু থেকেই কাভারযুক্ত তার ব্যবহার করা হলে সেই হার অনেক অনেক কম হতো। এখনো যদি সব কাভারবিহীন তার অপসারণ করে কাভারযুক্ত তার লাগানো হয়, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা অনেক অনেক কমে যাবে। আমরা চাই অতিদ্রুত দেশের সব বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন থেকে কাভারবিহীন তারগুলোকে কাভারযুক্ত তারে রূপান্তর করা হোক। মানুষের জীবন আরো নিরাপদ হোক। মানুষের জীবনের মূল্য যেন কাভারযুক্ত তারের চেয়ে কম বিবেচনা না করা হয়। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের আন্তরিকতা এবং দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করছি।
নূর আহমদ : শিক্ষক ও কলামিস্ট
https://web.facebook.com/NurAhmed.TeacherAndColumnist
Comments
Post a Comment