উন্নত দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশ যেখানে পিছিয়ে
নূর আহমদ
এক. বাংলাদেশে ঘুষ-দুর্নীতি অবাধে চলছে। স্বাধীনতার পর থেকে এই পর্যন্ত এমন কোনো ‘পাঁচ বছর’ অতিক্রান্ত হয়নি, যেই পাঁচ বছর ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ বা একেবারে সীমিত পরিসরে ছিল। দুর্নীতি দমনের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, আইন-আদালত-প্রশাসন সব আছে, তবু দুর্নীতি লাগামহীনভাবে চলছে। এদেশে বেসরকারি চাকরিজীবির চেয়ে সরকারি চাকরিজীবিরা, প্রশাসনের লোকেরা ঘুষ-দুর্নীতিতে বেশি জড়িত। দুদকের কর্তাব্যক্তিরা, পুলিশ, রাজনীতিবিদরা যেই দেশে ঘুষ খায়, সেই দেশে অন্যরা ঘুষ খেতে পিছিয়ে থাকবে কেন! ঘুষ শুধু একটি জাতীয় সমস্যার নাম নয়, অসংখ্য জাতীয় সমস্যার মূল।
দুই. দেশের রাজনীতি অনেক অনেক দূষিত। ইউরোপে যারা থাকেন, তারা জানেন, ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির সাথে আমাদের দেশের নির্বাচনী সংস্কৃতির তফাৎ যোজন যোজন। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেভাবে নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা মানুষের কাছে ভোট ভিক্ষা করে, অন্ততঃ এটা ইউরোপের অনেক দেশে নেই। এরপর আছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি। উন্নত দেশগুলোতে প্রতিহিংসার রাজনীতি বলতে কিছুই নেই। বছরে বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বা রাজনীতির বলি হয় কত মানুষ, সেই পরিসংখ্যানও বাংলাদেশের রাজনীতি কতটা দূষিত, সেই বিষয়টা তুলনা করার জন্য একটা সূচক হতে পারে।
তিন. পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায়ের সুযোগ আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার একটা বড় কলঙ্ক। যুগের পর যুগ ধরে এই সুযোগে অনেক দুর্বল শিক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বড় যে সমস্যাগুলো হচ্ছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী কাঙ্খিত চাকরি পাচ্ছে না। অনেকে চলে যাচ্ছে বিদেশ। এই মেধা পাচারের একটা বড় কারণ পাবলিক পরীক্ষায় অসদুপায়ের সুযোগ।
চার. অতিরিক্ত সড়ক দুর্ঘটনা বাংলাদেশকে উন্নত দেশগুলো থেকে অনেক পিছিয়ে দিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধ বা হ্রাসকরণে কার্যকরী পদক্ষেপের অভাবেই দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু এবং পঙ্গু হবার ঘটনা বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কিছু কারণ হলো:
ডিভাইডার বিহীন মহাসড়ক বা মাত্র দু’লেন বিশিষ্ট মহাসড়ক, অপ্রশস্থ সড়ক, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ বিচরণ, চালকদেরকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান না করা, মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা। বাংলাদেশে ১ বছরে যত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়, অনেক দেশে ২০ বছরেও তত মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় না।
পাঁচ. বাংলাদেশে খুন এবং ধর্ষণ একেবারে নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা। প্রতিদিন-ই এখানে মানুষের হাতে মানুষ খুন হয়। প্রতিদিন-ই ঘটে ধর্ষণের ঘটনা। প্রতিদিন বাংলাদেশে গড়ে ১০ জনের বেশি মানুষ খুন হয়। অনেক খুনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও আসে না। আর ধর্ষণের ঘটনা তো অনেক সময় ভিকটিম নিজ প্রয়োজনেই গোপন রাখে। তবু দৈনিক পত্রিকায় আর কোনো সংবাদ নিয়মিত প্রকাশ করতে না হলেও ধর্ষণ বা গণধর্ষণের সংবাদ নিয়মিতই ছাপাতে হয়।
খুন-ধর্ষণের মতো চূড়ান্ত জঘণ্য অপরাধগুলো নিয়ন্ত্রণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশে ১ মাসে যতগুলো খুনের ঘটনা ঘটে, উন্নত অনেক দেশে ১০ বছরেও ততগুলো খুনের ঘটনা ঘটে না। আর উন্নত অনেক দেশে ধর্ষণের বিচার যতো শক্তভাবে করা হয়, আমাদের দেশে সে হিসেবে ধর্ষণের কোনো বিচারই করা হয় না। আপনি দেখবেন, প্রতিদিন পত্রিকায় খুন ও ধর্ষণের অসংখ্য ঘটনার সংবাদ ছাপা হয়, কিন্তু প্রতিদিন নয়, মাসে একবারও খুন বা ধর্ষণের বিচার বা রায় কার্যকরের সংবাদ ছাপা হয় না। এই বিচারহীনতাই দেশে খুন ও ধর্ষণ বৃদ্ধির আরো একটা বড় কারণ।
ছয়. বাংলাদেশে খুন-খারাবী ছাড়াও মানুষের অপমৃত্যুর আরো অনেক কারণ রয়েছে। একটি বড় কারণ হলো বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে ব্যবহৃত কভারবিহীন তার। প্রতি বছর কতো মানুষ এই কভারবিহীন তারে জড়িয়ে মৃত্যুবরণ করে, তার হিসাব কেউ রাখে কিনা, জানি না। তবে আপনি গুগলে ‘কভারবিহীন তারে মৃত্যু’ এরকম কোনো কথা লিখে খোঁজ করলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত কভারবিহীন তারে মৃত্যু-সংক্রান্ত সংবাদগুলোর লিঙ্ক দেখে যদি গুণতে শুরু করেন, গণনা করে শেষ করতে কষ্ট হবে। আমার বিশ্বাস, সারাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে ব্যবহৃত কভারবিহীন তারগুলোকে কভারযুক্ত তারে পরিণত করতে যতো টাকা খরচ হবে, তার চেয়ে একজন মানুষের জীবনের মূল্য অনেক অনেক বেশি। কিন্তু এই কথাটা আমি ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করতে কেন কষ্ট হচ্ছে! উন্নত অনেক দেশে বাংলাদেশের মতো এভাবে কভারবিহীন তারে জড়িয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মানুষ মৃত্যুর ঘটনা নেই বললেই চলে।
সাত. লোডশেডিংয়ের সাথে আমি শৈশবকাল থেকেই পরিচিত। আমাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছিল ১৯৯১ সালের দিকে। তখন থেকেই লোডশেডিংয়ের সাথে পরিচিত আমি। উন্নত অনেক দেশে নয়, শুনেছি আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতায়ও লোডশেডিংয়ের কথা মানুষ গত কয়েক বছর ধরে ভুলতে শুরু করেছে। কিন্তু আমরা কোনোভাবেই লোডশেডিংয়ের কথা ভুলে যাবার সুযোগ পাচ্ছি না। দেশের কথিত উন্নতির সাথে সাথে লোডশেডিং শব্দটি যেন আমাদের আরো পরিচিত বা বহুল আলোচিত শব্দ হয়ে উঠছে। আমরা সত্যিই এক দুর্ভাগা জাতি।
আট. নদীভাঙ্গনে প্রতিবছর বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ ভিটেমাটিছাড়া, বাস্তুহারা ও নিঃস্ব হয়ে যায়। যেসব দেশে নদী আছে, সেসব দেশে নদীভাঙ্গন থাকবেই। কিন্তু নদীভাঙ্গন প্রতিরোধ এবং নদীভাঙ্গনে নিঃস্ব মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। নদীভাঙ্গনে নিঃস্ব মানুষদের পুণর্বাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টার অভাব কতো প্রকট, তা নদীভাঙ্গন কবলিত মানুষদের খোঁজ-খবর নিলেই বুঝা যাবে। তাদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্বের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
নয়. বেকার এবং নিরীহ মানুষকে সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ আছে, দু’বেলা আহার জোগাতে যারা হিমশিম খায়। অন্য মৌলিক চাহিদাগুলোর কথা না-ই বা বলা হলো। এই মানুষগুলোকে সহায়তার জন্য অনেক দেশে অনেক নিয়ম প্রচলিত আছে। জাপানে শ্রমের মূল্য বেশি কওে দেয়া হয়েছে, যাতে ছোটখাটো কাজ করেও নিরীহ মানবশ্রেণি চলতে পারে স্বচ্ছলতার সাথে। যুক্তরাষ্ট্রে যারা থাকেন তারা জানেন, সেখানে নিরীহ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা দিয়ে তারা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারে।
দশ. বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য জিইয়ে রাখার জন্য অনেক নিয়ম করে রাখা হয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ি কিনতে পারবে কারা? যাদের হাতে টাকা বেশি আছে। মধ্যবিত্ত কেউ একটা গাড়ি কিনতে চাইলেও পারে না। অযৌক্তিক হারে ভ্যাট/ট্যাক্স ধার্য করে রাখার কারণে মধ্যবিত্তরা সাধ থাকলেও গাড়ি কেনার সাধ্য পায় না। একটা গাড়ির প্রকৃত দামের সাথে মোটা অঙ্কের শুল্ক ধার্য করার কারণে অন্য অনেক দেশে গাড়িটি যেই দামে কিনতে পাওয়া যায়, আমাদের দেশে গাড়িটি কিনতে তার চেয়ে কয়েক গুণ দাম দিতে হয়।
Comments
Post a Comment