ইউটিউব থেকে কিভাবে আয় করবেন? কিভাবে ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করবেন?
নূর আহমদ
সফল ইউটিউবার হতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই ধৈর্য ও সততার পরিচয় দিতে হবে। আপনার ভিডিওর বিষয়বস্তু হতে হবে ইউনিক বা ভিন্নধর্মী। চ্যানেল তৈরি করার সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার ভিউ ও সাবস্ক্রাইবার হয়ে যাবে অথবা হাজার হাজার টাকা আয় হবে এটা ভাবা ঠিক নয়। সফলতার জন্য সময় ও শ্রম দিতে হবে।
আগে ঠিক করুন চ্যানেলের বিষয়
প্রথমেই ঠিক করতে হবে আপনি কোন বিষয়ে কনটেন্ট তৈরি করবেন। যেমন: খেলাধুলা, শিক্ষা, টিউটোরিয়াল, বিনোদন, প্রযুক্তি, রান্না, ফ্যাশন, ভ্রমণ, মজার ভিডিওসহ নানা বিষয় নিয়ে ইউটিউবে চ্যানেল তৈরি করতে পারেন। তবে যেকোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে চ্যানেল তৈরি করলে দর্শকের কাছে তা বেশি গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চ্যানেলের নাম দিন
আপনার ভিডিওর বিষয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চ্যানেলের একটি স্বতন্ত্র নাম দিতে পারেন। চ্যানেল ট্যাগ ব্যবহার করুন; যা আপনার চ্যানেলটি খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।
আয় সম্পর্কে আগেই জেনে নিন
ইউটিউবের আয় মূলত পরোক্ষ আয় (প্যাসিভ ইনকাম)। ইউটিউবের ভিডিওতে বিজ্ঞাপন দেখিয়ে যে আয় হয় তার একটি অংশ ভিডিও নির্মাতা বা ক্রিয়েটরকে দেওয়া হয়। এখানে এমন কোনো সমীকরণ নেই যে এক হাজার ভিউ হলে এত ডলার আয় হবে। ইউটিউবে চ্যানেল খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ভিডিও মনিটাইজেশন করতে পারবেন না। ইউটিউব থেকে আয় করতে আপনাকে ইউটিউবের পার্টনার প্রোগ্রামে অংশ নিতে হবে। আপনার চ্যানেলটিতে ১২ মাসে কমপক্ষে এক হাজার সাবস্ক্রাইবার ও চার হাজার ঘণ্টা ওয়াচটাইম থাকলে, তা মনিটাইজেশনের জন্য আবেদন করা যাবে।
কীভাবে ভিউ বাড়াবেন
আপনার ভিডিওতে যথাযথ ও আকর্ষণীয় শিরোনাম ও থাম্বনেইল যুক্ত করুন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে ভিডিওর দর্শকের সংখ্যা (ভিউ) বাড়াতে পারেন। ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশের (আপলোড) সময় এন্ড স্ক্রিনে অন্য ভিডিও বা প্লে লিস্ট যুক্ত করুন। সঠিক ভিডিও ডেসক্রিপশন যোগ করুন। বিভাগ অনুসারে ভিডিওগুলো প্লে লিস্টে সাজান। প্রাসঙ্গিক ভিডিও ট্যাগ ব্যবহার করুন। ট্যাগ রিসার্চে ঞঁনবইঁফফু–এর মতো টুলগুলো ব্যবহার করতে পারেন। তা ছাড়া আপনি পেইড বুস্টও (বিজ্ঞাপন) করতে পারেন।
সতর্কতার প্রয়োজন আছে
আপনাকে অবশ্যই কপিরাইট ও কমিউনিটি গাইডলাইন মানতে হবে। এ নির্দেশনাগুলো না মানলে আপনার মনিটাইজেশন (আয়) বন্ধ হয়ে যেতে পারে, এমনকি আপনার চ্যানেলটি বন্ধও হতে পারে। কপিরাইট ও কমিউনিটি গাইডলাইনের তিনটি স্ট্রাইক থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একেকটি স্ট্রাইকের জন্য ভিডিও মুছে যাওয়া, লাইভ স্ট্রিমিং বন্ধ হওয়া, ভিডিও আপলোড করতে না পারার মতো ঘটনা ঘটে। আর তৃতীয় স্ট্রাইকে চ্যানেল বন্ধ করা হয়। তবে আপনি যদি মনে করেন, আপনার কপিরাইট স্ট্রাইকটি ভুল করে দেওয়া হয়েছে—তাহলে কাউন্টার নোটিফিকেশন দিতে পারেন।
এবার জেনে নিন কীভাবে ইউটিউব চ্যানেল তৈরি করবেন ও সাজাবেন
* youtube.com–এ যান। ওপরে ডান পাশে Sign In এ ক্লিক করে gmail দিয়ে Sign In করুন।
* ওপরে ডান পাশের গোল চ্যানেল আইকনে ক্লিক করে My Channel–এ ক্লিক করুন Use YouTube as বক্স আসবে। দুই শব্দের চ্যানেল নাম হলে তা দুটি ঘরে লিখে ফেলুন। আর দুই শব্দের চ্যানেল নাম না হলে নিচের Use a business or other name–এ ক্লিক করে পছন্দমতো চ্যানেল নাম লিখে Create Channel–এ ক্লিক করে চ্যানেল তৈরি করুন।
* সবার ওপরে ডান পাশে Create a video or post–এ (ক্যামেরার ওপর যোগ চিহ্ন দেওয়া আইকন) ক্লিক করলে Upload video এবং Go live অপশন পাবেন। এখান থেকে ভিডিও আপলোড করুন। শিডিউল পোস্টও করতে পারেন। ভিডিও টাইটেল, ভিডিও ডেসক্রিপশন, ট্যাগ, থাম্বনেইল ও প্লে লিস্ট যুক্ত করে ভিডিও পাবলিশ করুন।
* My Channel থেকে Customize Channel এ ক্লিক করে Channel Icon এবং Channel Art যোগ করুন। Channel Trailer যোগ করুন। হোম পেজ সাজান। প্লে লিস্ট তৈরি করুন।
* About–এ ক্লিক করে চ্যানেল ডেসক্রিপশন, ই–মেইল, লোকেশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লিংক যোগ করুন।
* Status and Features–এর পাশের Verify অপশনে ক্লিক করে মোবাইল নম্বর দিয়ে চ্যানেলটি অবশ্যই ভেরিফাই করে নিন।
আরো কিছু প্রয়োজনীয় পরামর্শ
* কোয়ালিটি ও তথ্যবহুল কন্টেন্ট তৈরি করুন। ভিডিও বেশি ভিউ পাওয়ার একমাত্র উপায় ভালো কন্টেন্ট তৈরি করা। আমি এখানে কিছু পয়েন্টের কথা বলব যেটার মাধ্যমে কোয়ালিটি কন্টেন্ট তৈরি করতে পারবেন।
* স্পেসিফিক অডিয়েন্সের জন্য কন্টেন্ট তৈরি করুন। ভিডিও তৈরি করার আগে সুন্দর ও কার্যকারী স্ক্রিপ্ট লিখুন। ভিডিও কন্টেন্ট তৈরি করতে স্ক্রিপ্টের গুরুত্ব অনেক।
* কন্টেন্টি সবার যাতে বোধগাম্য হয় তেমন করে তৈরি করুন। বেশি বেশি উদাহরণ দিন। দর্শকরা উদাহরণ পছন্দ করে।
* কিছু ভিজুয়াল দৃশ্য যোগ করুন।
* সবসময় ইউনিক কন্টেন্ট তৈরির চেষ্টা করুন। কারোর কন্টেন্ট আইডিয়া কপি করবেন না। আসল কন্টেন্টের গুরুত্বই আলাদা।
* নিয়মিত কন্টেন্ট আপলোড করুন। ভালো কন্টেন্ট তৈরির পাশাপশি নিয়মিত কন্টেন্ট আপলোড করাও জরুরী। এখন নিয়মিত বলতে প্রতিদিন কন্টেন্ট আপলোড দিতে হবে এমন নয়। আপনি যদি প্রতি সপ্তাহে যদি দুটো ভিডিও আপলোড করেন;তবে সেটা কনটিনিউ করতে হবে। আপনি যদি নিয়মিত কন্টেন্ট পাবলিশ না করে; অনেক সময় পরপর করেন তবে দর্শক আপনার কথা ভুলে যাবে।
সোস্যাল মিডিয়ায় যদি নিয়মিত কন্টেন্ট পাবলিশ করেন; তবে বেশি ইমপ্রেশন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। নিয়মিত কন্টেন্ট পাবলিশ করলে সোস্যাল মিডিয়া মানে ইউটিউব আপনার কন্টেন্ট প্রমোট করে।
আপনি যখন নিয়মিত কন্টেন্ট পাবলিশ করতে থাকবেন; তখন দর্শক আপনার ভিডিওর প্রতি আকর্ষিত হবে। এতে আপনার চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করার সম্ভাবনা কয়েকগুন বেড়ে যাবে।
* ইউটিউব এক্সপার্টদের মতে, সঠিক কিওয়ার্ডেব ব্যবহার আপনার ভিডিওকে র্যাংক করায়। র্যাংক ভালো মানে, বেশি ভিজিটর এবং বেশি সাবস্ক্রাইবার। উপরে দেখতে পাচ্ছেন কিভাবে টাইটেল দেওয়া হয়।
* ডেসক্রিপশন দেয়ার সময় সঠিকভাবে সকল ইনফরমেশন দেয়ার চেষ্টা করুন; যেমন: আপনার ভিডিওর আসল কন্টেন্ট সম্পর্কে মানে কিওয়ার্ড, টাইমস্ট্যাম্প, কোনো লিংক থাকলে সেটাও দিন।
* টাইমস্ট্যাম্প ইউজারদের যে অংশের কন্টেন্ট পছন্দ সেখানে জাম্প করতে সাহায্য করে। যেটা আপনার ভিডিওর ইউটার এক্সপেরিয়েন্স বৃদ্ধি করে। আপনার কন্টেন্টের কোনো উৎস বা কোনো প্রাসঙ্গিক লিংক থাকলে দিন।* ভিডিও ট্যাগের মাধ্যমে ইউজার আপনার ভিডিওকে সহজে খুজে পেতে পারে। আপনি সঠিক ভিডিও ট্যাগ ব্যবহার করলে সঠিক অডিয়েন্সের কাছে আপনার ভিডিও সহজে পৌছাবে।
আরো কিছু দরকারি বিষয়:
আকর্ষনীয় থাম্বনেইল দিন। ভিডিও ক্লিক করার পেছনে থামনেইলের ভুমিকা অনেক। ভিডিওর স্ক্রিপ্টটি আপলোড করুন।
স্টার্ট স্ক্রিন ও ইয়েন্ড ক্রিন যোগ করুন। ইয়েন্ড স্ক্রিনে আপনার চ্যানেলের প্রাসঙ্গিক বা একই ধরেনের ভিডিও যোগ করুন।
* ট্রেইলার তৈরি করুন। ট্রেইলারের মাধ্যমে আপনার অডিয়েন্সকে আপনার চ্যানেল সম্পর্কে জানাতে পারেন। আপনার ব্রান্ড সম্পর্কে জানাতে পারেন। চ্যানেলের ভিডিওর টাইপ সম্পর্কে জানান। কখন নতুন ভিডিও পাবলিশ করেন তা জানান।
* চ্যানেলের লুকটা আকর্ষনীয় করুন। চ্যানেলটা সুন্দরভাবে অপটিমাইজ করে সাজানো জরুরী। চ্যানেলে সুন্দরকরে এবাউট পেজটা সাজান সঠিক কিওয়ার্ড ব্যবহার করে। ডেসক্রিপশন লিখুন ও কভার ফটো সহ চ্যানেলটা আর্ট করুন।
* চ্যানেলের ডেসক্রিপশনটি যথাসম্ভাব ছোট ও আকর্ষনীয় করে তুলুন; সঠিক কিওয়ার্ডটি ব্যবহার করুন। আপনার চ্যানেল ডেসক্রিপশনের প্রথম ১০০-১৫০ ওয়ার্ড এসইওর ক্ষেত্রে খুবই কার্যকারী। চ্যানেল ডেসক্রিপশনে কল-টু-একশন বাটন যোগ করুন; যেমন: আপনার ইমেইল নম্বর ইত্যাদি।
* আপনার চ্যানেলের হোমপেজ সাজান। ভিডিও বেশি ভিউ এবং সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা বৃদ্ধি করতে চ্যানেলের হোমপেজ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। চ্যানেলের হোমপেজটা ভালোভাবে সাজাতে পারেন; যেমন: সেকশন ও প্লেলিস্ট যোগ করা, স্যোসাল মিডিয়া আইকন যুক্ত করা ইত্যাদি।
* নিয়মিত ভিডিও আপলোড করুন। কনটেন্ট আপলোড করার ক্ষেত্রে রেগুলারিটি মেনটেইন করুন। তবে এর মানে এটা নয়, প্রতিদিন আপনাকে ভিডিও দিয়ে যেতে হবে। যদি আপনি সপ্তাহে ৩ টি করে ভিডিও দেন, সেক্ষেত্রে প্রত্যেক সপ্তাহে তিনটি ভিডিও আপলোড করুন। একইসাথে আপলোড টাইম মেইনটেইন করবেন অবশ্যই। অর্থাৎ আজকে সন্ধ্যা ৭ টায় ভিডিও আপলোড করলে, পরবর্তীতে যখন আপলোড করবেন সেটিও অবশ্যই ঠিক ৭ টায় করবেন। এভাবে সময় এবং রেগুলারিটি ঠিক রেখে চেষ্টা করবেন নিয়মিত ভিডিও আপলোড করতে। এর ফলে আপনার চ্যানেল দ্রুত গ্রো করা শুরু করবে।
* হাই কোয়ালিটি ভিডিও তৈরি করুন। একটি ইউটিউব চ্যানেলের মূল হচ্ছে কনটেন্ট। সুতরাং এই কনটেন্ট তৈরির বিষয়ে আপনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সবসময় চেষ্টা করবেন হাই কোয়ালিটির কনটেন্ট চ্যানেলে আপলোড করতে। আপনার চ্যানেলে নিয়মিত দর্শক ধরে রাখতে ভালো মানের কনটেন্ট আপলোড করুন।
* ওয়াচ টাইমের বিষয়ে লক্ষ রাখুন। ওয়াচ টাইম অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় এটা আমরা সবাই জানি। সবসময় আপনার ভিডিওর ওয়াচ টাইম এর দিকে লক্ষ রাখবেন। ধরুন আপনি ১০ মিনিটের একটি ভিডিও আপলোড করেছেন, কিন্তু দর্শকরা সেটি কেবল ৩০ সেকেন্ড, ৫০ সেকেন্ড বা ১ মিনিট দেখে স্কিপ করে চলে যাচ্ছে।
এতে করে আপনার ভিডিওটি রিচ হারাচ্ছে। ইউটিউবের এলগরিদম ধরে নিচ্ছে আপনার ভিডিওতে এমন বিশেষ কিছুই নেই যা দর্শকদের উপকারে বা কাজে লাগতে পারে। কিন্তু যদি ১০ মিনিটের সেই ভিডিওটি অন্তত ৫/৭ মিনিট করে লোকেরা দেখে তবে আপনার ভিডিওটি আরো মানুষের সামনে সাজেস্ট করানো হবে। ফলে আপনার ভিডিওটির ভাইরাল হওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যাবে। সুতরাং যে করেই হোক, আপনার ভিডিওটি যেনো দর্শকরা অন্তত অর্ধেক বা তার থেকে কিছুটা বেশি সময় ধরে দেখে সে চেষ্টা করুন। এমন কিছু করুন যাতে দর্শক আপনার ভিডিও দেখতে বাধ্য হয়।
* আপনার ভিডিও সবার সাথে শেয়ার করুন। বর্তমান দিনে সোশ্যাল মিডিয়া সাইটগুলো ব্যবহার করেন এমন মানুষ হয়তো অনেক কম আছে। আপনিও নিশ্চয়ই কোননা কোনো সোশ্যাল সাইটের সাথে সংযুক্ত রয়েছে। এক্ষেত্রে অবশ্যই আপনার একাউন্টে আপনার ইউটিউব চ্যানেলের ভিডিওগুলো শেয়ার করুন। আপনি যদি আপনার চ্যানেলের ভিডিও আপনার সোশ্যাল একাউন্টে শেয়ার করতে না পারেন তবে ধরে নিবেন আপনার ভিডিও আপনার পছন্দ হচ্ছে না। আর যে ভিডিও আপনার পছন্দ হচ্ছে না সে ভিডিও কি করে অন্যের পছন্দ হবে? সুতরাং নিজের পছন্দ হচ্ছে এমন ভিডিও তৈরি করুন এবং সেটিকে বিভিন্ন সোশ্যাল প্লাটফর্মে শেয়ার করে দিন।
সবশেষ পরামর্শ : ধৈর্য ধরুন
* ধৈর্য্য রাখুন। ইউটিউবিং করে, কয়েক দিন বা কয়েক মাসেই আপনি একজন ‘সফল ইউটিউবার’ হয়ে যাবেন এমনটা চিন্তা করা বাদ দিয়ে দিন। ইউটিউবে সফল হতে গেলে আপনাকে যথেষ্ট পরিমাণে ধৈর্য্য ধরে কাজ করে যেতে হবে। ধৈর্য্য না থাকলে এই পেশাটি আপনার জন্য নয়।
Comments
Post a Comment