সরকারি চাকরিজীবিরাও ভালো নেই
সময় নিউজ রিপোর্ট
২০২০ সালের শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী করোনার ভয়াবহ থাবায় বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে। টানা দুই বছর করোনার এই ধাক্কা সামাল দিতে দিতে দিশেহারা অবস্থা থেকে যখন মানুষ একটু ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চিন্তা করছে, তখনই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। মানুষের কাটা ঘায়ে নুনের ছিঁটা দিচ্ছে যেন। এর প্রভাব যেমন পড়ছে ক্ষেত-খামার, কলকারখানায় খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের উপর, তেমনি পড়ছে কম বেতন পাওয়া সরকারি চাকরিজীবিদের উপরও।
সরকারি চাকরির কথা শুনলে অনেকেই মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবি মানেই একটি অভাবহীন ও প্রাচুর্যে ভরা জীবন। কিন্তু সচেতন মানুষরা অনুধাবন করেন, বিষয়টা বাস্তবে এমন নয়। বরং সরকারি চাকরিজীবিদের মধ্যে একটি শ্রেণি রয়েছে, যারা খুবই কম বেতনে চাকরি করেন। বিভিন্ন প্রাইভেট ব্যাংকে যারা অফিসার পদে চাকরি করেন, তাদের চেয়ে শেষের দিকের গ্রেডসমূহে চাকরি করা সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন এবং সুবিধা অনেক অনেক কম। সরকারি চাকরি মানেই যে প্রাচুর্যে ভরা চাকরি নয়, এই তুলনা থেকে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
দ্রব্যমূল্য আওতার বাইরে চলে গেলে শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষজন নয়, এর প্রভাব পড়ে মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণী পর্যন্ত। শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য যেমন জ্বালানি তেল, গ্যাস, পানিসহ বিদ্যুৎ ও পরিবহন সেবার মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী।
জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় সরকারি কর্মচারীরাও ভালো নেই। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যে নির্ধারিত আয়ের এসব চাকরিজীবীও দিশেহারা। পারিবারিক বাজেটে কাটছাঁট করে সংসার চালাচ্ছেন তারা। কষ্টে থাকলেও তারা আচরণবিধির কারণে নিজস্ব মতপ্রকাশ করতে পারছেন না। মনের কষ্ট মনেই চাপা দিয়ে রাখছেন।
সরকারের সবচেয়ে বেশি কর্মচারী তৃতীয় শ্রেণির। এ শ্রেণির কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। ১৬তম গ্রেড থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত হচ্ছে তৃতীয় শ্রেণি। ১৬তম গ্রেডে নিয়োগ পেয়ে ধাপে ধাপে ১১তম গ্রেডে যেতে হয়। ১১তম গ্রেডে যেতে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগে। ২০ বছর পর তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মূল বেতন হয় ১২ হাজার ৫০০ টাকা। বাড়ি ভাড়া, মেডিকেল ও যাতায়াত ভাতা মিলে তাদের বেতন দাঁড়ায় ২১ থেকে ২২ হাজার টাকায়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় শ্রেণির একজন কর্মচারীর কাছে কেমন আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা আর কেমন থাকব! সাধারণ মানুষ এমনকি সাংবাদিকরাও মনে করে, সরকারি চাকরি করলে আর অভাব থাকে না। তারা মনে করে, সরকারি চাকরি মানেই ঘুষ। আসলে তা নয়, একই অফিসের সব ডেস্কে ঘুষ থাকে না। ১৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর মধ্যে ঘুষের চাকরি করে বা করার সুযোগ পায় খুব কমসংখ্যক লোক। বেশিরভাগ সরকারি কর্মচারী খুব কষ্টে থাকে। স্বাভাবিক সময়ে তারা অর্থকষ্টে দিন পার করে। আর এখন বিশ^ব্যাপী মূল্যস্ফীতি। এ পরিস্থিতিতে আমরা কেমন আছি তা জানার চেষ্টা কেউ করছে না।’
তিনি বলেন, ‘একবার চিন্তা করে দেখুন, এ যুগে ২২ হাজার টাকায় আমরা কীভাবে চলি! হ্যাঁ, এটা ঠিক আমরা মাস শেষে নিশ্চিত বেতন পাই। করোনার সময় বেসরকারি সেক্টরের বেতন-ভাতা বন্ধ ছিল। সে সময় অনেকে বলেছে, সরকারি চাকরিজীবী ছাড়া অন্যরা খারাপ আছে। এখন বলা উচিত, আমরা সবাই খারাপ আছি।’
চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের বেতন-ভাতার হিসাব দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারী জানান, ২০ গ্রেডের কর্মচারীর মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। তারা পদোন্নতি পেয়ে ১৭ গ্রেডে যেতে সময় লাগে ১২ থেকে ১৫ বছর। ওই পর্যায়ে গিয়ে তাদের বেতন হয় ৯ হাজার টাকা। ভাতাসহ এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার টাকা। এ যুগে ১৭ হাজার টাকায় কী হয়! কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টার থেকে সচিবালয়ে যাওয়ার স্টাফ বাসেরও ভাড়া বাড়িয়েছে সরকারি কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড।
ওই কর্মচারী জানান, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেলে সব কিছুর দাম বেড়ে যায়। বাসের মালিক বাসভাড়া বাড়িয়ে দেয়, সবজিওয়ালা সবজির দাম বাড়ায়, মাছওয়ালা মাছের দাম বাড়িয়ে দেয়। এমনকি রিকশার, যা চালাতে ডিজেল পেট্রোল লাগে না, তারও ভাড়া বেড়ে যায়। বেসরকারি পর্যায়ে অফিসে গিয়ে বেতন বাড়ানোর কথা অন্তত বলা যায়। কিন্তু সরকারি চাকরিতে একথা বলার কোনো জো নেই।
২০১৫ সালে সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ পে-স্কেল দেওয়া হয়। এরপর প্রতি বছর মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর কথা ছিল। স্থায়ী পে-কমিশন গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছিল। কিন্তু নানা কারণ দেখিয়ে সরকার স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করেনি। আবুল মাল আবদুল মুহিত অর্থমন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন, আইনি কাঠামো না থাকায় স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করা সম্ভব নয়। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরি আইন করা হয়। তাতে স্থায়ী পে-কমিশন গঠনের বিধান করার পরও সরকার স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করেনি।
২০১৫ সালের পে-কমিশনে প্রায় সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দ্বিগুণ হয়েছিল। এ কারণে সরকারি চাকরির প্রতি সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের আগ্রহ অনেক বেড়েছিল। কিন্তু সাত বছরেও নতুন পে-কমিশন না হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা হতাশ।
২০১৫ সালের আগে সর্বনিম্ন বেতনের ধাপ ছিল ৪ হাজার ১০০ টাকা। অষ্টম পে-কমিশন সেটা বাড়িয়ে ৮ হাজার ২০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করে। পরে সর্বনিম্ন বেতন আরও ৫০ টাকা বাড়িয়ে ৮২৫০ টাকা নির্ধারণ করে চূড়ান্ত পে-স্কেলের ঘোষণা দেয় সরকার।
বাংলাদেশ বিচার বিভাগীয় কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শাহ মো. মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফরাসউদ্দিন কমিশনের মূল দুটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ দুটি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হলে কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে বৈষম্য অনেকটাই কমত। বৈষম্য আরও বেড়েছে নতুন পে-স্কেল দেওয়ার পরও কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সুযোগ দেওয়ায়। এর মধ্যে রয়েছে উপসচিবদের গাড়ি-সুবিধা দেওয়া। উপসচিবরা এখন গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা বিনা সুদে ঋণ পাচ্ছেন আর গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে ৫০ হাজার করে টাকা পাচ্ছেন। জ্বালানি তেল, ডমেস্টিক এইড অ্যালাউন্স ও টেলিফোন বিল প্রভৃতির মাধ্যমেও বৈষম্য বেড়েছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে শাহ মো. মামুন বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই ২০১৫ সালে সরকার একটা স্মার্ট বেতন স্কেল দিয়েছিল। যদি স্থায়ী পে-কমিশন গঠন করে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করা হতো, তাহলে সেটা স্মার্টই থাকত। দীর্ঘ সাত বছরেও নতুন পে-স্কেল না হওয়ায় সেই স্মার্ট স্কেল আজ রুগ্ন হয়ে পড়েছে। এটা মুমূর্ষু হওয়ার আগেই সরকারকে কিছু একটা করতে হবে।’
[দৈনিক দেশ রূপান্তরে ১৯ আগস্ট, ২০২২ তারিখে প্রকাশিত ‘‘ভালো নেই সরকারি চাকুরেরাও’’ শিরোনামের প্রতিবেদন অবলম্বনে]
Comments
Post a Comment