মোবাইল অপারেটরগুলো যেভাবে মানুষের পকেট কাটছে
ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স
মোবাইলের ব্যালেন্স শেষ হয়ে গেলে রিচার্জের সুযোগ নেই, এমন অবস্থায় কারো সাথে জরুরী কথা বলার জন্যই ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স নেয়া হয়। প্রথম প্রথম আমাকে দেয়া হতো ১৮ টাকা। যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু এখন দেয়া হয় ১০০ টাকা। ‘ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স’ ১০০ টাকা কেন? আমি অধিকাংশ সময় রিচার্জ করি ৪৯ টাকা। আমাকে অবশ্যই সব সময় ৪৯ টাকার কম ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স দেয়া উচিত। তাছাড়া এই ব্যালেন্স নেয়া হয় একেবারে আপৎকালীন সময়ে। ১০০ টাকা ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স দেয়ার কারণে গ্রাহকের কী সমস্যা হচ্ছে? প্রথম সমস্যা হচ্ছে, এই ১০০ টাকা শেষ হয়ে যাবার পর গ্রাহককে অবশ্যই ১০০ টাকার বেশি রিচার্জ করতে হবে। কারণ ১০০ টাকা তো কেটেই নেয়া হবে। এটা গ্রাহকের উপর একটা বড় চাপ। লাভ হচ্ছে মোবাইল অপারেটরের। দ্বিতীয় সমস্যা হচ্ছে, ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স দিয়ে কথা বলার সময় কলরেটের সর্বোচ্চ হার কাটা হয়। আমার একটি কল ছিল ৫ মিনিট ৪৪ সেকেন্ড। কাটা হয়েছে ১৩.৯৯ টাকা (২.৩৯টাকা/মিনিট হারে)! এই ১০০ টাকা ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স দিয়ে কথা বলা যাবে মাত্র ৪১ মিনিট। মানে ৪১ মিনিট কথা বললেই আমার এই ১০০ টাকা হাওয়া! অথচ আমি ৪৯ টাকা রিচার্জে ১০০ টাকায় (মূলতঃ ৯৮ টাকা) কথা বলতে পারি ১২০ মিনিটের মতো। বার্মিংহামে (ইউকে) আমার কাছের একজন থাকে। আমাকে কখনো অনলাইনে না পেলে সে অফলাইনে (মোবাইল নাম্বার থেকে) কল করে। সেদিন কল করার পর জিজ্ঞেস করলাম, এভাবে কথা বলার খরচ কেমন? সে বলল, ‘১ পাউন্ড (বাংলাদেশী ১২০টাকা) দিয়ে ১ ঘন্টার মতো কথা বলা যায়।’ সেই হিসেবে ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে ১০০ টাকায় কথা বলা যায় ৫০ মিনিট। কিন্তু আমাদের দেশের অপারেটরদের দেয়া ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স থেকে দেশের কারো সাথেই কথা বলা যায় মাত্র ৪১ মিনিট! ইমার্জেন্সী ব্যালেন্সকে এভাবে গ্রাহকের পকেট কাটার ফাঁদ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো গ্রাহক ইমার্জেন্সী ব্যালেন্সের আবেদন করলে তাকে অপশন দেয়া যেতো, ‘আপনি কত টাকা নিতে চান?’ কিন্তু গ্রাহকের চাহিদার কথা বিবেচনা না করে গ্রাহককে নিজেদের ইচ্ছেমতো বড় অঙ্কের ‘ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স’ দিয়ে গ্রাহকের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভরছে অপারেটরগুলো। আমার সংযোগ গ্রামীনফোন। বাংলালিঙ্কে ২০০ টাকাও নাকি দেয়া হয় ‘ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স’! একজন গ্রাহক প্রতি মাসে গড়ে যত টাকা রিচার্জ করেন, তার সর্বোচ্চ এক তৃতীয়াংশ টাকা অথবা সর্বশেষ ৫ রিচার্জের গড়ের এক তৃতীয়াংশ টাকা ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স হিসেবে দেয়া উচিত, এর বেশি কোনোভাবেই নয়। কারণ এটা শুধুই ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স। তাছাড়া ইমার্জেন্সী ব্যালেন্স দিয়ে কথা বলার সময় সর্বোচ্চ কলরেটে টাকা না কেটে সর্বোচ্চ কলরেটের অর্ধেক হারে কাটা উচিত।
ইন্টারনেট প্যাকেজ শেষে ‘পে এজ ইউ গো’
ইন্টারনেট প্যাকেজ শেষ হয়ে গেলে ‘পে এজ ইউ গো’ নামক একটা সিস্টেম চালু করে রেখেছে অপারেটরগুলো। বিশেষ করে গ্রামীন ফোন। একজন গ্রাহক ইন্টারনেট প্যাকেজ কেনার পর তা ব্যবহার শেষ হয়ে গেলে তাকে কোনো বার্তা (নোটিফিকেশন) না দিয়ে তার ব্যালেন্সে থাকা সবগুলো টাকা রকেটগতিতে কেটে নেয়া হয় এই সিস্টেমে। গ্রাহক বুঝতেই পারেন না।
কিছুদিন আগে আমি আমার ইন্টারনেট ব্যালেন্স দেখার জন্য *১২১# ডায়াল করে নির্দেশনা অনুসরণ করার পর একটি ম্যাসেজ আসে এই রকম: ‘‘বর্তমান অবশিষ্ট ইন্টারনেট ব্যালেন্স ৫০০০.৯৭এমবি মেয়াদ ২৮/১০/২০২২ পর্যন্ত। ব্যালেন্স শেষ হবার পর আপনি পে গো ইন্টারনেট উপভোগ করবেন, চার্জ ৫এমবি এর জন্য ৫.৬ টাকা পর্যন্ত। ...’’ এই হারে পে গো ইন্টারনেট ব্যবহার করলে এক জিবি (১০২৪এমবি) ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য খরচ হয় ১,১৪৬.৮৮ টাকা!! মগের মুল্লুককে ¤øান করে দেয়ার মতো ব্যাপার!
কেন? প্যাকেজ শেষ হয়ে গেলে গ্রাহককে নোটিফিকেশন দেয়া যায় না? গ্রাহককে অপশন দেয়া যায় না: ‘আপনার ইন্টারনেট ব্যালেন্স শেষ, আপনি কি ‘পে এজ ইউ গো’ ব্যবহার করবেন, নাকি করবেন না?’ এসব কিছুই না করে ডাকাতের মতো গ্রাহকের টাকা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে কেটে নেয় অপারেটর। এভাবে আর কত দিন?
ফিচার ফোনে ইন্সটলকৃত গেম
সিম্পনীসহ কিছু ফিচারফোনে অনেক গেম ডিফল্টভাবে ইন্সটল করে রাখা হয়, যেগুলো খেলতে গেলে ব্যালেন্স থেকে টাকা কেটে নেয়া হয়। হ্যান্ডসেট কোম্পানীগুলোর সাথে মোবাইল অপারেটররা চুক্তি করে এই গেমগুলো ইন্সটল করে রাখে গ্রাহকের পকেট কাটার জন্য। গ্রাহক গেমগুলো খেলতে গেলে যে টাকাটা কেটে নেয়া হয়, তা মোবাইল অপারেটর এবং হ্যান্ডসেট কোম্পানী ভাগাভাগি করে নিজেদের পকেটে ঢোকায়। আমার কাছে একটি সিম্পনি এল৪৫ মডেলের হ্যান্ডসেট আছে। সেখানে ঐধৎসড়হু নামে ডিফল্ট একটি অ্যাপ আছে, যেখানে ৫টি সাব মেনু আছে: ১. গেমস ২. ক্রিকেট আপডেট ৩. হাদীস ৪ কৌতুক ৫. প্রেম উক্তি। যে কোনো মেনুতে গিয়ে ওকে চাপলে সার্ভিসটি চালু হয়ে যায়। আর গ্রাহকের মোবাইল থেকে ইচ্ছেমতো টাকা কেটে নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায় সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর এবং আরো কিছু শ্রেণি। অনেক হ্যান্ডসেট ব্যবহারকারী না বুঝে বা কারো কারো শিশু এসব অ্যাপে গিয়ে ‘ওকে’ দিলেই ওই ব্যবহারকারীর ব্যালেন্স থেকে টাকা হাওয়া হতে শুরু করে। এসব কি অন্যায় নয়? মানুষ আগে নকিয়া, স্যামসাং, মোটোরোলা, সাজেম, সিমেন্স ইত্যাদি হ্যান্ডসেটে ইন্সটলকৃত গেমগুলো খেলতো কোনো খরচ ছাড়াই। অথচ এখন ফিচারফোনে গেম খেলতে টাকা লাগে। খুবই দুঃখজনক। এগুলো দেখার কি কেউই নেই?
প্রমোশনাল এসএমএস সার্ভিস
মেসেজ এসে টাকা কেটে নেয়, এমন সমস্যায় পড়েছেন, মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে এমন মানুষের সংখ্যা ৩০% শতাংশের বেশি হতে পারে। এই ৩০ শতাংশের অধিকাংশের মোবাইলে বিভিন্ন সার্ভিস চালু হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে বা অবচেতনভাবে। এসব সার্ভিস সম্পর্কে সচেতন নয়, এমন মানুষরা যখন দেখে তাদের মোবাইলে টাকা রিচার্জ করার পরপরই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, তখন তারা মোবাইলের দোকানে নিয়ে বা পরিচিত কাউকে দেখিয়ে সমস্যার সমাধান করে। অনেকে বিরক্ত হয়ে ওই সিম বাদ দিয়ে নতুন সিম কিনতে বাধ্য হয়। এসব সার্ভিস চালু করার জন্য অনেক সময় গ্রাহককে কলও করা হয়। তাছাড়া বিভিন্ন সার্ভিসের এড সংক্রান্ত মেসেজ এমনভাবে দেয়া হয়, মেসেজ দেখার পর কোনো বাটন প্রেস করলেই সার্ভিসটি চালু হয়ে যায়। অনেক সময় শিশুদের কাছে মোবাইল ফোন চলে যাবার পর শিশুরা ভুলে কিছু প্রেস করে ফেললেই কোনো সার্ভিস চালু হয়ে যায়। লাভবান হয় সংশ্লিষ্ট মোবাইল অপারেটর এবং এসএমএস সার্ভিস প্রোভাইডার। বিভিন্ন সার্ভিস চালু করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই সিস্টেম সহজ করে রাখা হয় গ্রাহকের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভরার জন্য। না, এভাবে নয়, যে কোনো সার্ভিস চালু করার জন্য সিস্টেম শক্ত করা দরকার। যেমন কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে চালু করা বা *১৪০# এরকম কোনো ওপেনার (এটা রবি’র ক্ষেত্রে) ডায়াল করে অপশনে গিয়ে চালু করা। কোনো এসএমএস সার্ভিস চালুর জন্য যেন গ্রাহককে কল করা না হয় এবং গ্রাহকের মোবাইলে মেসেজ দেয়া না হয়।
রিচার্জের মেয়াদ
রিচার্জের মেয়াদ শেষে ব্যালেন্স থাকা সত্তে¡ও টাকা রিচার্জ করতে হবে, নয়তো আপনার ব্যালেন্সে ১০০ বা তার চেয়ে বেশি টাকা থেকেও লাভ নেই, মোবাইল অপারেটরগুলো গায়ের জোরে আপনার বৈধ টাকাকে (ব্যালেন্স) অচল করে রাখে। প্রতি মাসে আপনাকে মোবাইলে রিচার্জ করতে হবে আপনার ব্যালেন্সে টাকা থাকা সত্তে¡ও, যদি আপনি কোথাও কল করতে চান। মানুষ অপারেটরগুলোকে আগেই টাকা পরিশোধ করে মোবাইল রিচার্জ (এটাও এক ধরনের পণ্য) কিনে নেয়, মানুষের সেই র্প্বূপরিশোধিত (প্রিপেইড) টাকাও তারা মানুষকে মানুষের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে দেয় না, এ কেমন মগের মুল্লুক! পৃথিবীতে প্রিপেইড পণ্য এমনিতেই খুব কম। পোস্টপেইডের চেয়েও প্রিপেইড পণ্য গ্রাহকের অধিক স্বাধীনভাবে ভোগ করার সুযোগ থাকা উচিত। কিন্তু মোবাইল রিচার্জের ক্ষেত্রে এটি ঠিক উল্টো। কলরেটসহ নানা শর্ত আরোপের পরও তারা মানুষকে সময় নিয়ে টাকাটা খরচ করতে দেয় না। এক মাসের মতো মেয়াদ বেঁধে দেয় টাকাটা খরচ করার জন্য, নয়তো টাকাটার ব্যবহার স্থগিত করে রাখে। নতুন করে রিচার্জ করলেই টাকাটা ব্যবহার করা যায়। সাথে আবারও মেয়াদ বেঁধে দেয়। একেবারে সংকীর্ণ মানসিকতা।
এক্ষত্রে বাংলালিঙ্ক আছে সঠিক পথে। অনেক আগ থেকেই তারা সকল সংযোগে আজীবন মেয়াদ দিয়ে দিয়েছে। অন্য অপারেটরগুলো বাংলালিঙ্কের দেখানো সঠিক পথ দেখেও প্রতি মাসে অন্যায়ভাবে গ্রাহকের পকেট কাটার পথ চালু করে রেখেছে। কত কাটবে আর! কত টাকা এদের চাই! মানুষকে আর কত বিরক্ত করা!
প্যাকেজের (মিনিট/ইন্টারনেট) মেয়াদ শেষে কেনা জিনিস হাওয়া
মোবাইল রিচার্জের মেয়াদ বেঁধে দেয়ার চেয়েও গুরুতর অন্যায় ইন্টারনেট বা মিনিট প্যাকেজের মেয়াদ শেষে অবশিষ্ট ডাটা/মিনিট হাওয়া করে দেয়া। ডাটা/মিনিট প্যাক কি কোনো কাঁচাবাজারের পণ্য, মেয়াদ শেষে যা পঁচে যায়? এগুলো কি প্রিজারভেটিভ দেয়া জিনিস, যা নির্দিষ্ট মেয়াদশেষে ব্যবহার-অনুপযোগী হয়ে পড়ে? মানুষ পকেটের টাকা দিয়ে প্যাকেজ কেনার পর যখন ইচ্ছা, তা খরচ করবে, যতদিনব্যাপী ইচ্ছা খরচ করবে, অপারেটররা সেখানে নাক গলানো কোনোভাবেই উচিত নয়। ডাটা/মিনিট প্যাক যারা কেনে, তারা প্রয়োজনেই কেনে। সবাই তো আর প্যাক কিনে তা রেখে দেয় না। অনেকে মেয়াদ শেষ হবার আগেই প্যাক শেষ করে ফেলে, কারো কারো সময় বেশি লাগে। সেখানে সময় বেঁধে দেয়ার কী অর্থ? বাজারে এমন কোনও পণ্য কি আছে, যাতে বিক্রেতা ক্রেতাকে শর্ত জুড়ে দেয়, আপনি এটা তিন ঘন্টার মধ্যেই ব্যবহার করে শেষ করতে হবে, নয়তো আমরা ফিরিয়ে নেব বা আপনাকে তা ব্যবহার করতে দেব না? ডাটা/মিনিট প্যাকই এর একমাত্র উদাহরণ।
একটু আগে আমার যেই ডাটা প্যাকের ব্যালেন্সের কথা আমি উল্লেখ করেছি, আমার সেই ৫০০০.৯৭এমবিও (৫জিবি) আমি ব্যবহার করতে পারিনি ওদের দেয়া সময়ে ব্যবহার করার সুযোগ না পাওয়ায়। কেনা জিনিস ওরা আমার কাছ থেকে গায়ের জোরে ফেরত নিয়েছে। এভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের পকেটের টাকায় কেনা মূল্যবান লক্ষ লক্ষ জিবি নষ্ট করে দেয়া হয় সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে। মানুষ পকেটের টাকায় কিনে সেই পণ্য ব্যবহার করতে পারে না।
আপনার না পোষালে আপনি দাম বৃদ্ধি করুন। কিন্তু কেনা জিনিসে মানুষের স্বাধীনভাবে ভোগের অধিকার কেড়ে নেবেন কেন? আর কতভাবে মানুষের পকেট কাটবেন?
বিভিন্ন অংকের রিচার্জে অনাকাঙ্ক্ষিত প্যাকেজ চালু
মোবাইল অপারেটররা নিজেদের প্রয়োজনে নানান রেটে নানান প্যাকেজ চালু করে রাখেন। সাধারণ মানুষ সেগুলো মুখস্থ করে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার একবার মোবাইল ব্যালেন্স শেষ হয়ে যাবার পর একটি জরুরী প্রয়োজনে অন্য কোনোভাবে রিচার্জ করার সুযোগ না থাকায় আমি ‘বিকাশ’ থেকে ১৭ টাকা রিচার্জ করি। আমার বিকাশে ছিলই তখন ১৭ টাকা, নয়তো আরো বেশি রিচার্জ করতাম। দেখি, আমার মোবাইলে একটি ডাকা প্যাক চালু হয়ে গেছে। খুবই সমস্যায় পড়লাম। দরকার ভয়েস কল করার সুবিধা। কিন্তু দেয়া হয়েছে ডাটা প্যাক। আমি কী করবো এই ডাটা প্যাক দিয়ে? এটা একটা তামাশা। আমার ওয়াই-ফাই কানেকশন আছে।
কিছুদিন আগে আমি কোনো এক প্রয়োজনে ৩ দিনের জন্য ডাটা প্যাক কিনতে নির্দিষ্ট ওপেনার ডায়াল করে দেখি একটি প্যাক আছে ৪৫ টাকা দামে। যেই সিম দিয়ে আমি ডাটা ব্যবহার করি, সেখানে ব্যালেন্স ছিল ১১ টাকা। আমি বিকাশ থেকে ৩৪ টাকা রিচার্জ করেছি। কিন্তু রিচার্জ শেষে দেখি আমার সিমে ৩ ঘন্টার জন্য ‘আনলিমিটেড ডাটা’ ব্যবহারের একটি অফার চালু করে দেয়া হয়েছে সেই ৩৪ টাকার বিনিময়ে। এই তামাশা এবং প্রতারণা কেন?
মোবাইল অপারেটরগুলো জানে, মানুষ এখন বিকাশ, নগদ ইত্যাদি মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমেও টাকা রিচার্জ করে। যে কোনো অংকের টাকা মানুষ মানুষের সুবিধামতো রিচার্জ করতে পারে। কিন্তু মানুষের রিচার্জকৃত টাকা আপনি আপনার পকেটে ভরে মানুষকে অনাকাক্সিক্ষত কোনো পণ্য দিলে মানুষ সেই পণ্য দিয়ে কী করবে? মানুষ আপনাকে টাকা দিয়েছে আলু কিনতে, আপনি মানুষকে জোর করে মরিচ দিয়ে দেয়ার অধিকার আপনাকে কে দিল? আপনার মাথায় কি বিবেক-বুদ্ধি বলতে কিছুই নেই? মোবাইল অপারেটরগুলোর সেন্স ঠিকই আছে। কিন্তু তারা অন্যায়ভাবে এই প্যাকেজগুলো চালু করে রেখেছে শুধুই নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য। এগুলো তাদের সম্পূর্ণ অবৈধ আয়। নির্দিষ্ট অংকের রিচার্জে কোনো প্যাক থেকে থাকলে মানুষ রিচার্জের সময় সেই প্যাক কিনবে কিনা, সেই অপশন দেয়া উচিত। নয়তো রিচার্জে প্যাক কেনার সিস্টেম বাদ দেয়া উচিত। মানুষ রিচার্জ করার পর পছন্দমতো প্যাক কেনার জন্য *১২১# (জিপি), *৮৪৪৪#; *১৪০# (রবি) এই রকম ওপেনার ডায়াল করেই প্যাক কিনতে পারবে। অথবা অপারেটরগুলোর মোবাইল অ্যাপে গিয়ে প্যাক কিনতে পারবে। আরেকটি অপশন হচ্ছে রিচার্জ কার্ড।
একটি সংযোগ কিনতে হয় বার বার
একটা সময় মোবাইল সংযোগের দাম অনেক টাকা ছিল। ২০০০ সালের আগে অনেক হ্যান্ডসেটের চেয়েও সংযোগের দাম ছিল বেশি। কিন্তু এখন ২০ টাকায়ও সংযোগ বিক্রি হয়। সেদিন দেখলাম, মাইকিং করে এয়ারটেল সিম বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১০ টাকায়। সাথে ২৫ জিবি ফ্রী! অবাক করা বিষয় হচ্ছে ১০ বা ২০ টাকায় কেনা সংযোগ হারিয়ে গেলে তা তুলতে ২০০ টাকা লাগে। সংযোগের ক্রয়মূল্য ২০০ টাকা, আর তোলার দাম ১০/২০ টাকা হলে বিষয়টা স্বাভাবিক হতো। কিন্তু মানুষের কেনা সংযোগ (সিম), যত টাকা দিয়েই মানুষকে কিনতে হোক না কেন, তা কোনোভাবে হাতছাড়া হয়ে গেলে তা তুলতে গিয়ে আবার টাকা গুনতে হবে কেন?
অনেকভাবে মানুষ একটা সিম হারাতে পারে। ১০ বছর ধরে একটা সিম ব্যবহারকারী অধিকাংশ মানুষই বিভিন্ন কারণে সেই সিম একাধিকবার হারিয়ে থাকেন। কখনো চুরি হয়, কখনো বেশি ব্যবহারে নষ্ট হয়, কখনো সিমের আকার বড় থেকে ছোট করতে গিয়ে (হ্যান্ডসেটের ভিন্নতার কারণে) মানুষ কেনা সিম পুণরায় তুলতে হয়। যেহেতু এখন সকল সিমে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু রয়েছে, তাই মানুষ কোনো কারণে সিম তুলতে গেলে তাকে আবার তা বিনামূল্যেই ফিরিয়ে দেয়া উচিত। মানুষ নিজ প্রয়োজনেই হারিয়ে যাওয়া সিম আবার সংগ্রহ করে। হারিয়ে যাবার পর যারা সেই সিম আবার তোলে, তারা তা শোকেসে রেখে প্রদর্শন করার জন্য নিশ্চয়ই তোলে না। তারা সিম তোলার পর তা ব্যবহার করতে গিয়ে অবশ্যই রিচার্জ করবে, অপারেটরগুলোকে টাকা দেবে। তবু কেন সেই সিম তুলতে বার বার পয়সা খরচ করতে হবে?
থ্রিজি থেকে ফোরজিতে মাইগ্রেট করতেও সিম পুণঃক্রয় করতে হয়। কেন? স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যায় না কেন? শুধুই গ্রাহকের পকেট কাটার জন্য।
১০ সেকেন্ড পালস
কয়েক বছর আগেও অধিকাংশ মোবাইল অপারেটরের কলরেটে ছিল ৬০ সেকেন্ড পালস। পরে বিটিআরসি সেটা পরিবর্তন করে ১০ সেকেন্ডে নামিয়ে আনে। কিন্তু এখনো কি তা সঠিক জায়গায় এসেছে? একজন লোক কথা বলবে ৫১ সেকেন্ড, তার কাছ থেকে ৬০ সেকেন্ডের খরচ কেটে নেয়া কিভাবে বৈধ? ইমার্জেন্সি ব্যালেন্স দিয়ে বা সর্বোচ্চ কলরেটে কথা বলার সময় এক সেকেন্ডের জায়গায় ১০ সেকেন্ডের খরচ কেটে নেয়া হলে কী অবস্থা দাঁড়ায়? গ্রাহকের পকেট কাটার এটাও একটা মোক্ষম পন্থা।
ব্যালেন্স ট্রান্সফারে
কোনো ব্যাংকের এক শাখা থেকে আরেক শাখায় লক্ষ লক্ষ টাকা ট্রান্সফারেও যখন কোনো চার্জ নেই, তখন এক সংযোগ থেকে আরেক সংযোগে ৫০ টাকা ট্রান্সফারে উভয় সংযোগ থেকে ২.৩৯ টাকা করে টাকা কেটে নেয়া হয়। মানুষ এই সব মোবাইল অপারেটরের কাছে অসহায়। এরা যেভাবে ইচ্ছা, সেভাবে মানুষের পকেট কাটছে। দেখার সত্যিই কেউ নেই।
কলরেট অপারে মেয়াদশেষে রকেট গতিতে কাটা হয় টাকা
আমি সাধারণত ৪৯ টাকা রিচার্জ করি। মিনিটে ৬৯ পয়সা হারে কাটা হয়। তবে বড় একটি শর্ত আছে। এই কলরেটের মেয়াদ ৭ দিন। রবি এবং গ্রামীণে প্রায় একই রকম অফার। এই ৭ দিনে যদি আপনি এই টাকা ব্যবহার না করে এর পর করেন, তাহলে সর্বোচ্চ কলরেটে টাকা কাটা হয়। ২০২১ সালে কয়েক মাস আমার এমন গেছে, আমি ৪৯ টাকা রিচার্জ করার পর অনেক সময় তা ৩-৪ দিনেই শেষ হয়ে গেছে। এরপর আবার রিচার্জ করতে হয়েছে। এরকম অনেক অনেক গ্রাহকের হতে পারে। অপারেটরগুলো এই দিক থেকেও লাভবান, আবার কেউ নির্দিষ্ট মেয়াদে তা ব্যবহার না করলে তার টাকা কেটে নেয় রকেট গতিতে, সেই দিক থেকেও অপারেটরগুলো লাভবান। মানুষকে এভাবে সময় বেঁধে দেয়ার কী অর্থ? কোনো অর্থ নেই, কোনো যৌক্তিকতা নেই, আছে শুধুই গ্রাহকের উপর চাপিয়ে দেয়ার অবাধ সুযোগ। কেউই তো নেই এই দেশে এগুলো দেখার। কিছু বলারও কেউ নেই। আমি কখনো হাতে সময় থাকলে অপারেটরের কাস্টমার কেয়ার লাইনে কল করে বলি, আপনারা বাঙ্গালীকে গরু-ছাগল ছাড়া কিছুই মনে করেন না। নয়তো এমন অযৌক্তিক সিস্টেম মানুষের উপর চাপিয়ে দিতেন না। আপনাদেরকে কেউ কিছু বলতে পারছে না। কিছু করতে পারছে না।
অবশ্য মানুষ কেন কিছু বলবে, কেন কিছু করবে? দেশে ভোক্তা অধিকার আইন আছে, আছে দুদক, আছে বিটিআরসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠান। মানুষ তো এসব বিষয়ে অপারেটরকে কিছু বলার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো রহস্যজনকভাবে চুপ থাকার কারণেই এই লেখা লিখতে হয়েছে। জানি, এতে কোনো লাভ হবে না। এটা অরণ্যে রোদন ছাড়া কিছু নয়।
নূর আহমদ
শিক্ষক, রোকনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বশিকপুর, সদর, লক্ষ্মীপুর।
Comments
Post a Comment