গ্রেড কমানোর সাথে বেতন কাঠামোর বৈষম্য দূরের সম্পর্ক নেই
নূর আহমদ
জাতীয় বেতন স্কেলের গ্রেড বা ধাপ ২০ থেকে কমিয়ে ১০টি করার চিন্তাভাবনা করার কথা শোনা যাচ্ছে। যদি এ কাজটি করা হয়, তাহলে সরকারের কর্মকর্তা—কর্মচারীদের নিজেদের মধ্যে যে বৈষম্য, তা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। কিন্তু সত্যিই কি বেতন কাঠামোর গ্রেড কমানোর সাথে বৈষম্য হ্রাস পাবার কোনো সম্পর্ক আছে?
এটা বুঝতে হলে আগে আমাদেরকে জানতে হবে বেতন কাঠামোয় কী বৈষম্য আছে?
বৈষম্যের চিত্র দেখতে হলে বর্তমান বেতন কাঠামোকে সামনে আনতে হবে এভাবে—
২০তম গ্রেড (৮২৫০) থেকে ১৯তম গ্রেডের (৮৫০০) ব্যবধান ২৫০ টাকা, ১৯তম থেকে ১৮তম গ্রেডের (৮৮০০) ব্যবধান ৩০০ টাকা, ১৮তম থেকে ১৭তম গ্রেডের (৯০০০) ব্যবধান ২০০ টাকা, ১৭তম থেকে ১৬তম গ্রেডের (৯৩০০) ব্যবধান ৩০০ টাকা, ১৬তম থেকে ১৫তম গ্রেডের (৯৭০০) ব্যবধান ৪০০ টাকা, ১৫তম থেকে ১৪তম গ্রেডের (১০২০০) ব্যবধান ৫০০ টাকা, ১৪তম থেকে ১৩তম গ্রেডের (১১০০০) ব্যবধান ৮০০ টাকা, ১৩তম থেকে ১২তম গ্রেডের (১১৩০০) ব্যবধান ৩০০ টাকা, ১২তম থেকে ১১তম গ্রেডের (১২৫০০) ব্যবধান ১২০০ টাকা, ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডের (১৬০০০) ব্যবধান ৩৫০০ টাকা, ১০ম থেকে ৯ম গ্রেডের (২২০০০) ব্যবধান ৬০০০ টাকা, ৯ম থেকে ৮ম গ্রেডের (২৩০০০) ব্যবধান ১০০০ টাকা, ৮ম থেকে ৭ম গ্রেডের (২৯০০০) ব্যবধান ৬০০০ টাকা, ৭ম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডের (৩৫৫০০) ব্যবধান ৬৫০০ টাকা, ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম গ্রেডের (৪৩০০০) ব্যবধান ৭৫০০ টাকা, ৫ম থেকে ৪র্থ গ্রেডের (৫০০০০) ব্যবধান ৭০০০ টাকা, ৪র্থ থেকে ৩য় গ্রেডের (৫৬৫০০) ব্যবধান ৬৫০০ টাকা, ৩য় থেকে ২য় গ্রেডের (৬৬০০০) ব্যবধান ৯৫০০ টাকা এবং ২য় থেকে ১ম গ্রেডের (৭৮০০০) ব্যবধান ১২০০০ টাকা।
বৈষম্যের কয়েকটি দিক দেখা যাক—
এক. ২০তম গ্রেড থেকে ১২তম গ্রেড পর্যন্ত ৮টি গ্রেডের গড় ব্যবধান ৪৩৫ টাকা (প্রায়)। অথচ ১২তম থেকে ১১তম গ্রেডের ব্যবধান ১২০০ টাকা। ৮টি গ্রেডের গড় ব্যবধানের চেয়ে মাত্র ১টি গ্রেডে ব্যবধান যেখানে অনেক কম হবার কথা, সেখানে এতো বেশি কেন?
দুই. ১৯তম গ্রেডে যিনি চাকরি শুরু করেন, চাকরির ১০ম বছরে প্রথম গ্রেড উন্নয়নে তাঁর বেতন বাড়ে ৩০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডে যিনি চাকরি করেন, চাকরি শুরুর ১০ বছর পর প্রথম গ্রেড উন্নয়নে তাঁর বেতনও বাড়ে সেই ৩০০ টাকা। এটা কি সুবিচার? ১৯তম গ্রেডে চাকরিজীবির যোগ্যতা এবং সেবা আর ১৩তম গ্রেডে চাকরিজীবির যোগ্যতা ও সেবা কি তাহলে সমান!
তিন. ২০তম গ্রেড থেকে ১৯তম গ্রেডে উন্নীত হলে বেতন বাড়ে ২৫০ টাকা, ১৯তম থেকে ১৮তম গ্রেডে উন্নীত হলে বেতন বাড়ে ৩০০ টাকা। বেতন বৃদ্ধির গতিটা এখানে ধীর হলেও স্বাভাবিক। কিন্তু ১৮তম থেকে ১৭তম গ্রেডে বেতনের ব্যবধান ২০০ টাকা কেন? উন্নীত গ্রেডে গেলে ২০তম এবং ১৯তম গ্রেডের চাকরিজীবির চেয়ে ১৮তম গ্রেডে চাকরিজীবির বেতন কম বাড়বে কেন? একইভাবে ১৪তম গ্রেডে চাকরিজীবির চেয়ে ১৩তম গ্রেডে চাকরিজীবির বেতন উন্নীত গ্রেডে গেলে কম বাড়বে কেন? নিচের গ্রেডে চাকরিজীবির বেতন বাড়ে ৮০০ টাকা আর এক গ্রেড উপরে চাকরি করেও বেতন বাড়ে মাত্র ৩০০ টাকা! এরকম বৈষম্য আরো কয়েকটা গ্রেডেই করা হয়েছে।
চার. ২০তম গ্রেড থেকে ১২তম গ্রেড পর্যন্ত বেতনের মোট ব্যবধান ৩০৫০ টাকা, কিন্তু মাত্র ১১তম থেকে ১০ম গ্রেডের ব্যবধান—ই ৩৫০০ টাকা। ৮ শ্রেণিকে ঠকিয়ে এক শ্রেণিকে লাভবান করার উদ্দেশ্য কী? যে ৮ শ্রেণিকে ঠকানো হয়েছে, সেই ৮ শ্রেণির চাকরিজীবি কি প্রজাতন্ত্রের সেবক নয়? তারা কি প্রজাতন্ত্রের শত্রু? তাদের দ্বারা কি প্রজাতন্ত্রের কোনো কল্যাণ হয় না? পক্ষান্তরে যে বিশেষ শ্রেণিকে লাভবান করা হয়েছে, তাদের দ্বারা কি প্রজাতন্ত্রের অতিরিক্ত সেবা হয়? তারা কি প্রজাতন্ত্রের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ?
পাঁচ. ১০ম গ্রেড থেকে ৯ম গ্রেডে বেতনের ব্যবধান ৬০০০ টাকা, কিন্তু ৯ম থেকে ৮ম গ্রেডের ব্যবধান মাত্র ১০০০ টাকা কেন? কাছাকাছি দুইটি ব্যবধানে এমন আকাশ—পাতাল তফাৎ কেন? বেতন কাঠামো যে নিরপেক্ষভাবে প্রণয়ন করা হয়নি, এটা তার উৎকৃষ্ট একটি প্রমাণ। একটা শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়েছে, আরেকটা শ্রেণিকে হাতে ধরে ঠকানো হয়েছে। বেতন কাঠামোর ২০টি গ্রেডের সর্বশেষ গ্রেডে যে বেতন ধার্য করা হবে, উপরের প্রতিটা গ্রেডে বেতন তুলনামূলক বাড়বে, এটাই বেতন বৃদ্ধির স্বাভাবিক ধারা হবার কথা। কিন্তু বেতন কাঠামোয় গ্রেডে গ্রেডে স্বাভাবিক বৃদ্ধির ধারাকে এভাবে বার বার ভেঙে ফেলা হয়েছে। বেতন বৃদ্ধির ধারা কেন একবার উপরের দিকে গেছে, আবার নিচের দিকে নেমে গেছে? ধারাটি কখনো কচ্ছপের গতিতে হাঁটে কেন, আবার কখনো কখনো খরগোশের গতিতে দৌড়ে কেন?
ছয়. ২০তম থেকে ১২তম গ্রেড পর্যন্ত গ্রেডগুলোতে বেতনের ব্যবধান সর্বনিম্ন ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা, গড় ব্যবধান ৩৮০ টাকা (প্রায়)। কিন্তু এর উপরের গ্রেডগুলোতে বেতনের ব্যবধান সর্বনিম্ন ১০০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১২০০০ টাকা, গড় ব্যবধান ৬০৬০ টাকা (প্রায়)! উপরের ১১টি গ্রেডের ব্যবধানগুলোর মধ্যে দুইটি ব্যবধান ১০০০ ও ১২০০ বাদ দিলে অবশিষ্ট সবগুলো ব্যবধান ৩৫০০ টাকার উপরে। শেষের ৮টি গ্রেডের কোনো ব্যবধানই চার অংকের ঘর স্পর্শ করতে পারেনি, অথচ শুরুর গ্রেডগুলোর ব্যবধান শুধু চার অঙ্কের ঘর—ই স্পর্শ করেনি, বরং ১১টি ব্যবধানের ৮টিই ৩৫০০ বা তার চেয়ে বেশি! এরকম ব্যবধানের নাম বৈষম্য ছাড়া আর কী হতে পারে!
বেতন কাঠামোয় বহুমাত্রিক বৈষম্যের পাশাপাশি কিছু অসঙ্গতিও আছে। যথা:
এক. বর্তমান বেতন কাঠামোয় গ্রেড উন্নীত হলে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমে যায়। যেমন: ১৫তম গ্রেডে যারা চাকরি শুরু করে, তাদের বাড়িভাড়া ভাতা থাকে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ। কিন্তু প্রথম গ্রেড উন্নীত হলে তাদের বাড়িভাড়া ৫ শতাংশ কমে যায়। ১৫তম গ্রেডে চাকরিজীবি একজন লোক চাকরির ১০ম বছরে প্রথম উন্নীত গ্রেডে যাওয়ার পর তার মূলবেতন বাড়ে ৫০০ টাকা। কিন্তু মূলবেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি তার বাড়িভাড়া ভাতা ৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় তার মোট বেতন ৫০০ টাকাও বৃদ্ধি পায় না! ১০ বছর পর একজন চাকরিজীবির মূলবেতন ৫০০ টাকা বৃদ্ধির পথেও কাঁটা বিছিয়ে দেয়া হয় মূলবেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বাড়িভাড়া ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়ে। প্রহসন আর কাকে বলে?
সরকারি চাকরিজীবিদের বাড়িভাড়া ভাতা দেয়া হয় মুলত: আবাসস্থল সংক্রান্ত খরচের জন্য। বাসাভাড়া হোক, বাড়ি নির্মাণ হোক বা মেরামত, এই খাতে মানুষের খরচ দিন দিন বৃদ্ধিই পায়। কিন্তু চাকরির বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে বাড়িভাড়া ভাতার হার কমিয়ে দেওয়াটা কি বাস্তবতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, নাকি সাংঘর্ষিক? বিষয়টা সাপলুডু খেলায় ছোট একটি মই পাবার পরপরই বড় কোনো সাপের মুখে পড়ে যাবার মতোই।
দুই. বর্তমান বেতন কাঠামোয় ২০টি গ্রেডের পাশাপাশি ২৯৪টি ধাপ রয়েছে। বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রে ধাপগুলোকে যেমন বিবেচনায় নেয়া হয়, গ্রেড উন্নীত হবার ক্ষেত্রেও ধাপগুলোকে একইভাবে বিবেচনায় নেয়া হয়। ফলে কী হয়? ১০ বছর চাকরির পর একজন চাকরিজীবির মূলবেতন ৮০০ টাকা বৃদ্ধির কথা থাকলেও মূলবেতন ৮০০ টাকা না বেড়ে বাড়ে মাত্র ৪০০ টাকা! এই ‘লেজে কুকুর নাড়ায়’ নিয়মের ফলে ১০ বছর চাকরির পর একটা গ্রেড বৃদ্ধি পাওয়াটাই শুধু অর্থহীন হয়ে যায়, তা নয়, বরং ২০টি গ্রেডও অর্থহীন হয়ে যায়। ধাপের কারনে মূলবেতন পরবর্তী গ্রেডে যেতে না পারার কারণে ধাপগুলোই প্রকারান্তরে গ্রেডে পরিণত হয়। তার মানে বেতন কাঠামোয় গ্রেড মাত্র ২০টি নয়, বরং ২৯৪টি!
তিন. বেতন কাঠামোয় টিফিন ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০০ টাকা। মাসে যদি ২০টি কর্মদিবস হয়, তাহলে দৈনিক টিফিন ভাতা হয় ১০ টাকা। ১০ টাকা দিয়ে একজন লোক কিভাবে টিফিন করবে? এমন সামান্য ভাতা ধার্য করার কী অর্থ?
চার. শিক্ষাভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে সন্তানপ্রতি ৫০০ টাকা হারে। সন্তানটি প্রাথমিকে পড়ুক, উচ্চ বিদ্যালয়ে পডুক বা কলেজে পড়ুক, সবক্ষেত্রে ৫০০ টাকা কি পর্যাপ্তÍ? কোন বিবেচনায় ভাতাটি এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে?
বেতন কাঠামোয় গ্রেড কমানোর সাথে বৈষম্য দূর করার কোনো সম্পর্ক নেই। গ্রেড ১২টি বা ৮টি করা হলেও বৈষম্য থেকে যেতে পারে। ১০টি বা ১৬ টি গ্রেড নির্ধারণ করা হলেও যদি গ্রেডগুলোর মধ্যকার পার্থক্য আনুপাতিক হারে সমান না থাকে, তাহলে গ্রেড কমিয়ে লাভ নেই। গ্রেডগুলোর মধ্যকার বৈষম্য দূর করা বেশি প্রয়োজন। ২০টি গ্রেড রেখেই গ্রেডে গ্রেডে ব্যবধান আনুপাতিক হারে সমান করে দিলে আমার মনে হয় বেতন কাঠামো নিয়ে আর বিতর্ক থাকবে না।
‘বেতন কাঠামোর ধাপ ২০ থেকে কমিয়ে ১০ করার চিন্তা’ শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় ৪ জুলাই, ২০২৩ তারিখে, যা তৈরি করেছেন আশরাফুল হক। প্রতিবেদনের শেষ অংশে উল্লেখ করা হয়, ‘‘সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণভাবে যদি স্কেল কম হয় তবে সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন ব্যক্তির মধ্যকার যে বেতনের পার্থক্য রয়েছে, তার কিছুটা কমবেশি করা যাবে। তাও নির্ভর করবে গ্রেডগুলো কত টাকা থেকে শুরু হবে তার ওপর। শুধু ২০ থেকে ১০টি করলেই হবে না। গ্রেডগুলো কোনটাতে শুরু হবে আর কোনটাতে গিয়ে সর্বোচ্চ হবে, তার ওপরও নির্ভর করবে। তবে এটা দিয়ে সহজেই বৈষম্য নিরসন হবে এমন নয়। প্রথমত এ কার্যক্রম শুরু হলে একটা ক্ষেত্র প্রস্তুত হবে। সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্নের মধ্যে যে পার্থক্য তা কিছুটা নিরসন হবে। কিন্তু সেটি নির্ভর করবে স্কেলগুলো কীভাবে হবে, একটির সঙ্গে আরেকটির পার্থক্য কী রকম হবে, তার ওপর। দ্বিতীয়ত, স্কেল ছাড়াও তারা বিভিন্ন সুযোগ—সুবিধা পায়, সেখানে একেকজন টেলিফোন বিল, গাড়ির বিলসহ বিভিন্ন বিল পায়। সেগুলো বিবেচনায় আনতে হবে। এটি আয়—বৈষম্য কমানোর একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। তবে কীভাবে ডিজাইন করবে সেটি না জানলে এটি স্পষ্ট বলা যাবে না।’’
আমি মনে করি, ডিজাইনের জন্য সবচেয়ে সেরা পন্থা হবে, ২০ তম গ্রেড (প্রান্তিক গ্রেড) নির্ধারণ করে ওই গ্রেড থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়িয়ে বাড়িয়ে উপরের গ্রেডগুলো নির্ধারণ করা এবং বর্তমানে যেই ২৯৪টি ধাপ রয়েছে, সেগুলো বাদ দেয়া। এটাই হবে সমতার নীতি এবং বৈষম্যহীন বেতন কাঠামো।
নূর আহমদ
শিক্ষক ও গবেষক
শিক্ষক, রোকনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বশিকপুর, সদর লক্ষ্মীপুর—৩৭০৬।
আপনার সুচিন্তিত মতামত জানান ফেসবুকে: নূর আহমদ
Comments
Post a Comment