আরেকটা বিষয় দেখা যাক। ২০ তম গ্রেডের মূল বেতন ৮২৫০ টাকা। সেখান থেকে উপরের গ্রেডগুলোতে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ যথাক্রমে ২৫০ টাকা, ৩০০ টাকা, ২০০ টাকা, ৩০০ টাকা, ৪০০ টাকা, ৫০০ টাকা, ৮০০ টাকা, ৩০০ টাকা। সর্বশেষ ৩০০ টাকা বেড়ে ১৩ তম গ্রেড থেকে ১২ তম গ্রেডে মূল বেতন হয় ১১৩০০ টাকা। এই ৮টি গ্রেড উন্নীত হবার পর ৮ গ্রেডে সর্বমোট মূল বেতন বেড়েছে ৩০৫০ টাকা। অথচ দেখুন, ৮ম গ্রেড (২৩০০০ টাকা) থেকে প্রথম গ্রেডে বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ যথাক্রমে ৬০০০ টাকা, ৬৫০০ টাকা, ৭৫০০ টাকা, ৭০০০ টাকা, ৬৫০০ টাকা, ৯৫০০ টাকা, ১২০০০ টাকা। সর্বশেষ ১২০০০ টাকা বেড়ে ১ম গ্রেডে বেতন হয় ৭৮০০০ টাকা। উপরের দিকের এই ৮টি গ্রেডের কোনোটিতে ৬০০০ টাকার কমে বেতন বাড়েনি!
শেষ ৮ গ্রেডে সব মিলিয়ে যেখানে বেতনের ব্যবধান ৩০৫০ টাকা, সেখানে প্রথম ৮টি গ্রেডে প্রতিটিতে বেতনের ব্যবধান তার দ্বিগুণ! কেন এই বৈষম্য? শেষ দিকের গ্রেডগুলোতে যারা চাকরি করেন, তাদের প্রতি এই অবিচার কেন?
শেষ দিকের গ্রেডগুলোতে অনেক ক্ষেত্রে প্রমোশনের সুবিধাও নেই। পুরো চাকরিজীবনে সর্বোচ্চ তিনবার গ্রেড পরিবর্তন হয়। যদি পরিবর্তনের সুবিধা এতো সামান্য (৩০০-৪০০ টাকা) হয়, তাহলে সেই পরিবর্তন রেখেই বা আর লাভ কী! যদি বেতন কাঠামো প্রনেতাদের (আমলা) পকেট থেকে টাকা দিয়ে শেষ দিকের গ্রেডগুলোতে চাকরিজীবিদের বেতন শোধ করতে হয় বলে তাদের মনে হয়, তাহলে শেষ দিকের গ্রেডগুলোতে চাকরিজীবিদের ক্ষেত্রে গ্রেড পরিবর্তনের সুবিধাটাই বাতিল করে দেয়া হোক!
নিজেরা মাছের বড় টুকরাগুলো খেয়ে মাছের কাঁটাগুলো অন্যদের জন্য রেখে দেয়ার কী প্রয়োজন!
আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শ্রমজীবিদের শ্রদ্ধা করতে শিখি। জানি না, যারা বেতন কাঠামো প্রণয়নের দায়িত্ব পায়, তারা কি ওই পাঠগুলো থেকে কিছুই শেখে না? দেশ থেকে আয়বৈষম্য দূর করা যায় না এই স্বার্থপর আমলাদের জন্যই।
>>করোনার সময় সরকারি চাকরিজীবিদের বেতন চালু থাকায় সুবিধা হয়েছে কাদের?
নিচের গ্রেডগুলোতে ব্যবধান কম থাকায় অষ্টম শ্রেণি পাস একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা নৈশপ্রহরীর বেতন ও স্নাতক পাস কর্মচারীর (তৃতীয় শ্রেণির অনেক চাকরিজীবি) বেতন প্রায় কাছাকাছি। একজন নৈশপ্রহরী অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণের সনদ দিয়ে চাকরি নিয়ে বেতন পায় ৮২৫০ টাকা, আর একজন স্নাতক পাশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বেতন পান ৯৭০০ টাকা। তাহলে অষ্টম শ্রেণি পাশের পর চাকরি নিয়ে নিলেই তো হয়, নবম শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত আরো ৭-৮ বছর (কার্যক্ষেত্রে ৯-১০ বছর) পড়ালেখা করার প্রয়োজন কোথায়!
তাছাড়া স্নাতক পাশ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের বেতন যদি তিন গ্রেড উন্নীত হবার পরও মাত্র ১৬০০ টাকা বৃদ্ধি পায়, তাহলে প্রায় একই স্তরের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পন্ন একজন সরকারি কলেজের শিক্ষকের বেতন কেন মাত্র এক গ্রেড উন্নীত হলেই ৬০০০ টাকার বেশি বৃদ্ধি পাবে? এই বৈষম্যগুলো দেখার জন্য কি দেশে আমলা ছাড়া আর কেউ নেই?
জাতীয় বেতন কাঠামো ২০১৫ অনুযায়ী বর্তমানে টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড না থাকায় একটি গ্রেড অতিক্রম করতে সাধারণত ১১ বছর অপেক্ষা করতে হবে। যাঁরা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পেয়ে কয়েকটি গ্রেড ওপরে উঠে গেছেন, তাঁদের সঙ্গে নতুন চাকরিজীবীদের বেতন গ্রেডে ব্যবধান ও বৈষম্য অনেক। এই বৈষম্য কি কখনো দূর করা হবে না?
আমরা চাই, সরকার অবিলম্বে বেতন কাঠামোয় গ্রেডে গ্রেডে ব্যবধান আনুপাতিক হারে সমান করে দেবে। এজন্য সরকারের নিকট ৬টি সুপারিশ:
১. প্রতি গ্রেডে ব্যবধান আনুপাতিকহারে সমান করে দেয়া হোক। এতে উপরের দিকের গ্রেডে যারা চাকরি করে, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ তারা চাকরির শুরু থেকেই বড় স্কেলে চাকরি করে।
‘আনুপাতিকহারে সমান’ করার প্রক্রিয়া এমন হতে পারে: প্রতি গ্রেডে ২০ শতাংশ বা ২৫ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি করা যেতে পারে, ঠিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের মতো। গ্রেডে গ্রেডে ব্যবধান এভাবে আনুপাতিকহারে সমান রাখা হলে কোনো শ্রেণির চাকরিজীবি অসন্তুষ্ট হবে না; সবাই যার যার স্কেল এবং উন্নীত গ্রেড নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে।
২. ২০ গ্রেড থেকে কমিয়ে ১৬ গ্রেড করা হলে অনেক দিক থেকে ভালো হতে পারে।
৩. প্রতি ৮ বছর পর পর যেন সকল চাকরিজীবির বেতন গ্রেড পরিবর্তন করা হয়, চাকরিজীবনে ন্যূনতম ৩ বার যেন উন্নীত গ্রেডে যাবার সুযোগ থাকে। এতে যেসব পদে প্রমোশনের সুযোগ নেই, সেসব পদে চাকরিজীবিদের মনে হতাশা কমবে। যেমন: তৃতীয় শ্রেণির চাকরিজীবি যারা, তারা ১২ তম গ্রেডে চাকরি শুরু করবে, এরপর প্রতি ৮ বছর পর পর নতুন গ্রেডে যেতে যেতে শেষে ৯ম গ্রেড পর্যন্ত পৌঁছবে, এভাবে ১ম শ্রেণির চাকরিজীবিরা ৪র্থ গ্রেডে চাকরি শুরু করবে, এরপর প্রতি ৮ বছর পর পর নতুন গ্রেডে যেতে যেতে ১ম গ্রেড পর্যন্ত পৌঁছবে। এতে কোনো শ্রেণির চাকরিজীবি নিজের শ্রেণি অতিক্রম করে উপরের শ্রেণি স্পর্শ করার সম্ভাবনাও থাকবে না, যা বর্তমান কাঠামোয় আছে এবং অযৌক্তিক।
৪. সরকারি চাকরিতে যেহেতু মোট ৪টি শ্রেণি, গ্রেড কমিয়ে ১৬টি করে নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৬টি গ্রেডকে ৪ শ্রেণি দিয়ে ভাগ করে প্রতি শ্রেণির প্রান্তিক গ্রেডকে সেই শ্রেণিতে নিয়োগের প্রারম্ভিক গ্রেড হিসেবে নির্ধারণ করা হোক। যেমন: প্রথম শ্রেণির চাকরিজীবিদের নিয়োগ হবে ৪র্থ গ্রেডে, দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিজীবিদের নিয়োগ হবে ৮ম গ্রেডে। তাহলে সব শ্রেণির চাকরিজীবিই নিজের পদ, সম্মান ও বেতন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবে; বর্তমান কাঠামোর অনেক জটিলতা এবং অসঙ্গতিও দূর হবে।
৫. বেতন কাঠামোয় বর্তমান ২০ গ্রেডের ভেতরে ভেতরে যেসব খুচরা খুচরা ধাপ রাখা হয়েছে, সেগুলো রাখার কোনো যৌক্তিকতা আছে কিনা, সে ব্যাপারে জনমত যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এগুলোর যৌক্তিকতা বা প্রয়োজনীয়তা নেই বলেই অধিকাংশ মানুষ মতামত দিতে পারে।
৬. বর্তমান কাঠামোয় গ্রেড উন্নীতকরণের পাশাপাশি বাড়িভাড়া কমানোর নিয়ম রাখায় উন্নীত গ্রেডে যাওয়াটা অনেকের জন্য বঞ্চনা ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বাড়িভাড়া তো দিন দিন বাড়েই, কমে না। তাহলে কেন বাড়িভাড়া কমানো হবে? বাড়িভাড়া কমানোর নিয়ম উন্নীত গ্রেডে যাবার সাথে সাংঘর্ষিক। তাই এই নিয়ম বাতিল করা উচিত।
নূর আহমদ : সরকারি চাকরিজীবি
আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে পারেন এই পেইজে গিয়ে: https://www.facebook.com/nurahmad.bangladeshi/posts/104529757819418
Comments
Post a Comment